ম.ম.রবি ডাকুয়া,বাগেরহাট সংবাদদাতা :
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাবে উত্তাল সমুদ্র উপকূলীয় জনপদ; আবহাওয়া অধিদফতর দেশের সব সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি করেছে।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুস্পষ্ট লঘুচাপটি ঘনীভূত হয়ে মৌসুমি নিম্নচাপে রূপ নেওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলসহ সারাদেশে দুর্যোগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিম্নচাপটি বর্তমানে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন ভারতের উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থান করছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
রোববার দুপুরে আবহাওয়া অফিসের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নিম্নচাপটি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৫১০ কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণপশ্চিমে এবং মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ২৮৫ কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থান করছে। এর প্রভাবে উপকূলীয় জেলাগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে বাতাসের গতিবেগ ও সমুদ্রের উত্তাল ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টায় আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঝোড়ো হাওয়ার প্রভাবে সমুদ্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ায় উপকূলীয় জনপদে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
নিম্নচাপের এই সক্রিয় উপস্থিতির ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছেন উপকূলীয় জেলে ও সমুদ্রগামী নাবিকরা। বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে আসার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ বর্তমানে ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার রেকর্ড করা হলেও দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে তা ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ছোট নৌযানগুলোর জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
জেলেদের অভিযোগ, সতর্ক সংকেত জারির পরপরই সমুদ্রে থাকা ট্রলারগুলোর জন্য দ্রুত তীরে ফেরা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র বা নিরাপদ জেটির অভাবে ট্রলারগুলোকে মাঝ সমুদ্রে বা অরক্ষিত মোহনায় নোঙর করতে হচ্ছে। সমুদ্র উত্তাল থাকায় মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার মৎস্যজীবী পরিবার জীবিকার সংকটে পড়েছে এবং উপকূলীয় অর্থনীতিতে সাময়িক স্থবিরতা নেমে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, নিম্নচাপটি পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উড়িষ্যা উপকূল অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, উপকূলীয় এলাকার পরিস্থিতির ওপর তারা সার্বক্ষণিক নজর রাখছে এবং যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমুদ্রবন্দরগুলোতে সতর্কতা বজায় রাখতে এবং নিয়মিত মাইকিংয়ের মাধ্যমে উপকূলীয় জনগণকে সচেতন করতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে দুর্যোগকালীন সময়ে সমুদ্রের গভীর এলাকায় কোনো নৌযান যাতে অবস্থান না করে, সে বিষয়ে কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশকে টহল জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় জেলেদের দাবি, দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়ার সাথে সাথে তাদের জন্য জরুরি উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা প্রয়োজন যাতে কোনো ট্রলার সাগরে আটকা না পড়ে।
মৌসুমি নিম্নচাপের এই প্রভাব কেবল সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের স্বাভাবিক জনজীবন ও যাতায়াত ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে। সমুদ্র উত্তাল থাকা এবং উপকূলীয় এলাকায় ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় সামুদ্রিক পণ্য পরিবহন ও খালাস প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক সরবরাহ চেইন ও বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত উত্তর বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের নৌ-চলাচল ও মাছ ধরার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের তীব্রতা ও ঘনঘন দুর্যোগের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রযুক্তির ব্যবহার এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।












