রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
একই সঙ্গে সোহেল রানাকে পাঁচ লাখ টাকা এবং স্বপ্না আক্তারকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। অর্থদণ্ডের টাকা আদায়ে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে ভুক্তভোগী পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
রোববার (৭ জুন) দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দুই আসামি আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। রায়কে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই আদালত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
রায় ঘোষণার পর সন্তোষ প্রকাশ করেন নিহত শিশু রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। তিনি বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আমি শতভাগ সন্তুষ্ট। আমার মনের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এই রায়ে পেয়েছি। এখন দ্রুত রায় কার্যকরের অপেক্ষায় আছি।”
তিনি বিচারক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যমকর্মী এবং দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পেয়েছে। আমরা রায়ে সন্তুষ্ট।”
আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহও রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “অপরাধী তার অপরাধের বিচার পেয়েছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
বিচার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার এত কম সময়ে সম্পন্ন হওয়ার নজির খুবই বিরল। আলোচিত এ মামলায় বিচার শুরুর পর মাত্র পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, “তদন্ত শেষ থেকে বিচার ও রায় ঘোষণার পুরো প্রক্রিয়াটি দেশের বিচারব্যবস্থায় একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।”
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) ও আপিল প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হলে আগামী তিন মাসের মধ্যেই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্ভব হতে পারে।
গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবী থানার ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে শিশু রামিসার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্না আক্তারকে আটক করা হয়। পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ঘটনায় সেদিনই রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। পরদিন আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সোহেল রানা দোষ স্বীকার করেন।
ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ২৪ মে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এরপর দ্রুত বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। ২ জুন ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন সাক্ষ্য দেন। ৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।
অবশেষে ঘটনার মাত্র ২০ দিনের মাথায় রায় ঘোষণা করলেন আদালত।
মামলার যুক্তিতর্ক চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, সোহেল রানার দেওয়া জবানবন্দিতে উঠে এসেছে যে, ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে বাসার দরজা খুলে দিয়েছিলেন স্বপ্না আক্তার। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ, জবানবন্দি ও অন্যান্য উপাত্ত পর্যালোচনা করে দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন।
এই রায়ের মাধ্যমে আলোচিত রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

















