মো. পারভেজ সরকার, রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা :
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে একটি চালকল দেখিয়ে একাধিক লাইসেন্স গ্রহণ এবং দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত চালকলের নামেও সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কর্মসূচির আওতায় চালের বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে অর্ধশতাধিক চালকল মালিকের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপজেলার নিবন্ধিত ১৪২টি চালকলের মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টির অস্তিত্ব বা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই সরকারি চাল সরবরাহের বরাদ্দ পাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, এভাবেই বছরের পর বছর অচল ও অস্তিত্বহীন মিলের নামেও সরকারি চালের বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অভিযোগে থাকা একাধিক চালকল বহু বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। কোথাও মিলঘর তালাবদ্ধ, কোথাও আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ভরে গেছে। কয়েকটি মিলে বয়লার, ড্রায়ার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কোথাও চালকলের জায়গায় অন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে সাইনবোর্ডও নেই। স্থানীয়দের দাবি, এসব মিলে দীর্ঘদিন ধরে ধান ভাঙানো বা চাল উৎপাদনের কোনো কার্যক্রম নেই। এরপরও এসব প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কর্মসূচিতে চাল সরবরাহের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলা চালকল মালিক সমিতির পরিচালক এস. এম. সাগর সরকারের নামে মেসার্স আনোয়ারা সেমি অটো চালকল ও মেসার্স সারা চালকল নামে দুটি লাইসেন্স রয়েছে। এর মধ্যে একটি চালকল প্রায় ১২ বছর ধরে পরিত্যক্ত। তবুও চলতি ২০২৬ সালের সিদ্ধ চাল সংগ্রহ কর্মসূচিতে প্রতিষ্ঠান দুটির নামে ১৬৪ মেট্রিক টনের বেশি চাল সরবরাহের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া মেসার্স মামা-ভাগ্নে সেমি অটো চালকল-এর মালিক আব্দুস সোবাহানের বিরুদ্ধে একটি চালকল দেখিয়ে নিজের ও স্বজনদের নামে তিনটি লাইসেন্সের মাধ্যমে ২০৯ মেট্রিক টনের বেশি চালের বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে মেসার্স সামি সেমি অটো চালকল ও মেসার্স খাজা সেমি অটো চালকল-এর মধ্যে একটি সচল থাকলেও অপরটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপরও দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে ১৯১ মেট্রিক টনের বেশি চালের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১৫ বছর ধরে পরিত্যক্ত মেসার্স আকন্দ সেমি অটো চালকল-এর নামেও রয়েছে ৬২ মেট্রিক টনের বরাদ্দ। এ ছাড়া আরও অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও একটি চালকল বা একই চাতাল দেখিয়ে একাধিক লাইসেন্সের মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চান্দাইকোনা ইউনিয়নের চান্দাইকোনা গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওমর সেমি অটো চালকল এবং ওমেলা সেমি অটো চালকল-এর অস্তিত্ব থাকলেও লুৎফা সেমি অটো চালকল নামে কোনো মিলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সরেজমিনে দেখা যায়, বর্তমানে মিল প্রাঙ্গণে আগাছা জন্মেছে, বয়লারের অস্তিত্ব নেই এবং সাইনবোর্ডও দেখা যায় না। অভিযোগ রয়েছে, একই চাতাল দেখিয়ে বাবা-ছেলের নামে চারটি লাইসেন্স ব্যবহার করে বছরের পর বছর সরকারি বরাদ্দ নেওয়া হচ্ছে। চলতি মৌসুমেও প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ১৪৭ মেট্রিক টন চালের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
চান্দাইকোনা এলাকার বাসিন্দা এস. এম. সোহাগ সরকার অভিযোগ করে বলেন, আনোয়ারা, বিশাল, সারা, কহিনুর, সমন্বয়, পিতা-পুত্র, মামা-ভাগ্নে, সোহাগ-৩, সোনালী, খাজা, হাজী কাউসার, নুসরাত, সরকার, রাফি, লুৎফা ও ওমর নামসহ অর্ধশতাধিক চালকলের বিরুদ্ধে একই চাতাল দেখিয়ে তিন থেকে চারটি লাইসেন্সের মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব মিলের অনেকগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম বহু বছর ধরে বন্ধ থাকলেও কাগজে-কলমে সচল দেখিয়ে সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক মিলের পরিবেশগত ছাড়পত্রও ২০১৩ সালের পর আর নবায়ন করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বছরের পর বছর একই পদ্ধতিতে একটি মিল বা একই চাতাল দেখিয়ে একাধিক লাইসেন্সের মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দ নেওয়া হলেও কার্যকর তদারকি ও যাচাই-বাছাইয়ের অভাবে এ অনিয়ম অব্যাহত রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিক চালকল মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁদের অধিকাংশই কথা বলতে রাজি হননি। তবে যাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেছে, তাঁরা প্রায় একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
উপজেলা চালকল মালিক সমিতির পরিচালক এস. এম. সাগর সরকার বলেন, শ্রমিক সংকটের কারণে আমার একটি মিল বন্ধ ছিল। আবার চালু করা হবে। সরকার নিয়ম অনুযায়ী লাইসেন্স দিয়েছে এবং চুক্তির ভিত্তিতেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটা কোনো ব্যাপার না।
অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে চালকল মালিক আব্দুস সোবাহান বলেন, আমার জায়গায় আমি মিল করেছি। আপনাকে কৈফিয়ত দেব কেন? প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট অফিসে গিয়ে সব কাগজপত্র দেখে নিতে পারেন।
আরেকজন হাজী কায়সার সেমি অটো চাল কলের মালিক মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, এক সময়ে ডিসি ফুড থেকে শুরু করে অনেকে আমাদের লাইসেন্স করতে বলেন। পরে আবেদন করে ২ টি লাইসেন্স নিয়েছি। একটি বন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার একটা চাতাল ও বয়লার আছে প্রয়োজন হলে আমার ভাতিজার বয়লার ব্যববহার করি।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, খাদ্য সংগ্রহ কর্মসূচিতে নিবন্ধিত চালকলের তালিকা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়। কোনো অনিয়মের লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. হারুন অর রশিদ বলেন, আমাদের একটি মনিটরিং টিম সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই সব বৈধ চালকলকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তারপরও অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর, সিরাজগঞ্জের সহকারী পরিচালক মো. তুহিন আলম বলেন, অধিকাংশ রাইস মিলের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। খুব শিগগিরই ছাড়পত্রবিহীন এসব মিলকে নোটিশ দেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নবায়ন না করলে মিলগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
















