মোবাশ্বের নেছারী, কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা :
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় তিন হাজার মানুষের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ৩০ মেট্রিক টন সরকারি (জিআর) চাল এক মাসেরও বেশি সময় ধরে গুদামেই পড়ে রয়েছে।
অথচ বন্যার সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে সেই ত্রাণের একটি কেজি চালও পৌঁছেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ. এম. খোদাদাদ হোসেনের বিরুদ্ধে অবহেলা ও দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন জনপ্রতিনিধিরা।
একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, উপজেলা প্রশাসনের অব্যবস্থাপনার কারণে জুন মাসে উপজেলার ৪১ হাজার ১০২ জন টিসিবি গ্রাহকের জন্য বরাদ্দ ২ লাখ ৫ হাজার ৫১০ কেজি চালও সময়মতো উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। ফলে পুরো চালের বরাদ্দ ফেরত যায়।
উপজেলা ত্রাণ শাখার হিসাব অনুযায়ী, চলতি বন্যায় দুই হাজার ৬৪০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। একই সময়ে নদীভাঙনের শিকার হন আরও শতাধিক মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় তিন হাজার মানুষের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩০ মেট্রিক টন জিআর চাল এবং ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়।
গত ২৯ জুন বরাদ্দের পরদিন ৩০ জুন চাল ও শুকনো খাবার উত্তোলন করা হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তিন কার্যদিবসের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ শেষ করার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, ৩০ মেট্রিক টন চালের একটি দানাও বিতরণ করা হয়নি। শুধু ৩০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বন্যাকবলিত ইউনিয়নে না দিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে বন্যামুক্ত রামখানা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের নামে ১৫ মেট্রিক টন এবং সন্তোষপুর ইউনিয়নের প্রশাসকের নামে আরও ১৫ মেট্রিক টন চাল উত্তোলন করে সরকারি গুদামে সংরক্ষণ করা হয়।
রায়গঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরিফুজ্জামান দীপ বলেন, “বন্যার সময় আমার ইউনিয়নের দুটি ওয়ার্ড, বিশেষ করে ফান্দের চর এলাকার মানুষ পানিবন্দি ছিলেন। বারবার যোগাযোগ করেও কোনো ত্রাণ পাইনি। পরে শুনেছি চাল বরাদ্দ হয়েছিল, কিন্তু আমাদের কাছে তা পৌঁছেনি।”
কেদার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আ. খ. ম. ওয়াজিদুল কবীর রাশেদ বলেন, “বন্যার্তদের জন্য ১০ কেজি করে চাল বরাদ্দ ছিল। কিন্তু আমরা কোনো চাল পাইনি। শুনেছি অন্য দুই ইউনিয়নের নামে চাল উত্তোলন করে গুদামে রাখা হয়েছে। এক মাস পেরিয়ে গেলেও তা বিতরণ হয়নি।”
অন্যদিকে রামখানা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন বলেন, “আমার ইউনিয়ন কখনো বন্যাকবলিত হয় না। ইউএনওর নির্দেশে আমার নামে ১৫ মেট্রিক টন এবং সন্তোষপুর ইউনিয়নের প্রশাসকের নামে ১৫ মেট্রিক টন চাল উত্তোলন করে গুদামে রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে সেই চাল ফেরত দেওয়া হবে।”
এদিকে টিসিবির চাল নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সময়মতো ছাড়পত্রে স্বাক্ষর না করায় ৪১ হাজার ১০২ জন গ্রাহকের জন্য বরাদ্দ ২ লাখ ৫ হাজার ৫১০ কেজি চাল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। ফলে পুরো চালের বরাদ্দ ফেরত যায়।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ. এম. খোদাদাদ হোসেন। তিনি বলেন, “বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের আগেই বন্যার পানি নেমে যায়। নিয়ম অনুযায়ী চাল ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। তবে চাল উত্তোলন করে গুদামে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে আবার বন্যা হলে সেই চাল বিতরণ করা হবে।”
টিসিবির চাল ফেরত যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “বিশেষ কারণে আমার অনুপস্থিতির সময় চাল উত্তোলনের নির্ধারিত সময় পার হয়ে যায়। তবে গ্রাহকদের অন্যান্য বরাদ্দকৃত পণ্য বিতরণ করা হয়েছে।”
দুর্যোগের সময় বরাদ্দ হওয়া সরকারি ত্রাণ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে না পৌঁছে গুদামে পড়ে থাকা এবং একই সময়ে বিপুল পরিমাণ টিসিবির চাল ফেরত যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকরা।
















