মোবাশ্বের নেছারী, কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা :
দাম বাড়ছে, কমছে পাথরের মান। এমন অভিযোগে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে পাথর আমদানি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রেখেছেন বাংলাদেশি আমদানিকারকরা।
গত ১৮ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া এ সিদ্ধান্তে দেশের ১৮তম সোনাহাট স্থলবন্দরের পাথর বাণিজ্য কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। চার দিন ধরে বন্দরে প্রবেশ করেনি একটি ভারতীয় পাথরবাহী ট্রাকও। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আমদানিকারক, শ্রমিক ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
বুধবার (২২ জুলাই) সরেজমিনে সোনাহাট স্থলবন্দর ঘুরে দেখা যায়, এক সময়ের ব্যস্ত বন্দরে এখন নীরবতা। বিশাল ওয়্যারহাউস প্রায় ফাঁকা। বন্ধ রয়েছে পাথর খালাস ও ক্রাশিং কার্যক্রম। কাজ না থাকায় অলস সময় কাটাচ্ছেন শ্রমিকরা।
স্থলবন্দর-সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণ সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০টি ভারতীয় ট্রাক পাথর নিয়ে সোনাহাট বন্দরে প্রবেশ করে। কিন্তু গত ১৮ জুলাই থেকে আমদানি বন্ধ থাকায় টানা চার দিনে একটি ট্রাকও বাংলাদেশে আসেনি। ফলে সরকারের রাজস্ব আদায়েও বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
আমদানিকারকদের অভিযোগ, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা আগের মতো বড় আকারের রিভার স্টোন বোল্ডার সরবরাহ না করে ছোট, মাটি ও বালুমিশ্রিত নিম্নমানের পাথর দিচ্ছেন। এসব পাথর ক্রাশিং করার পর প্রয়োজনীয় মাপ পাওয়া যায় না। ফলে সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদাররা এসব পাথর কিনতে আগ্রহ হারিয়েছেন।
শুধু মানের অবনতি নয়, হঠাৎ করেই পাথরের দামও বাড়ানো হয়েছে।
আগে প্রতি টন রিভার স্টোনের মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার রুপি বা ১১-১২ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০০ রুপি বা প্রায় ১৩ দশমিক ৫ থেকে ১৪ ডলার। ফলে বাংলাদেশে পৌঁছাতে প্রতি টনের খরচ প্রায় ৪০০ টাকা বেড়ে গেছে। স্থলবন্দরের কমিশন এজেন্ট শুক্কুর আলী বলেন, “প্রতিদিন গড়ে ১৫ ট্রাক পাথর দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাতাম। কিন্তু গত চার দিনে একটি ট্রাকও পাঠাতে পারিনি। ব্যবসা পুরোপুরি স্থবির হয়ে গেছে।”
ব্যবসায়ী মাইদুল ইসলাম বলেন, “আসামে পাথরের রয়্যালটি জটিলতার কারণে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা নিম্নমানের পাথর সরবরাহ করছেন। এসব পাথর দিয়ে মানসম্মত নির্মাণকাজ সম্ভব নয়। তাই ঠিকাদাররাও কিনতে চাইছেন না।”
সোনাহাট স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন ব্যাপারী বলেন, “একদিকে নিম্নমানের পাথর, অন্যদিকে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন। তাই পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত আমদানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক আবু হেনা মাসুম বলেন, “বর্তমানে ভারত থেকে যে পাথর আসছে, তা নির্মাণকাজের উপযোগী নয়। মানসম্মত পাথর ও যৌক্তিক দাম নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমদানি চালু হবে না।” পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বন্দরের শ্রমিকরা। খালাস, পরিবহন ও ক্রাশিং কাজ বন্ধ থাকায় তাদের অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা।
সোনাহাট স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক আমিনুল হক বলেন, “দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সৃষ্ট সমস্যার কারণে পাথর আমদানি বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিদিন সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান হলে আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।”
ব্যবসায়ীদের দাবি, ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা আগের মতো মানসম্মত রিভার স্টোন সরবরাহ এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে পাথর আমদানি পুনরায় চালু হবে না। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘায়িত হলে স্থানীয় অর্থনীতি, নির্মাণ খাত এবং সরকারের রাজস্ব আহরণে এর প্রভাব আরও গভীর হবে।


















