জেসমিন মনসুর, কার্ডিফ (ওয়েলস), যুক্তরাজ্য সংবাদদাতা :
যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে উন্মোচন করা হয়েছে ওয়েলসের প্রথম ফার্স্ট মিনিস্টার ও ‘ডিভলিউশনের জনক’ হিসেবে পরিচিত রাইট অনারেবল রডরি মর্গানের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য।
সেনেড (ওয়েলস পার্লামেন্ট) ভবন ও ঐতিহাসিক পিয়ারহেড বিল্ডিংয়ের মাঝামাঝি স্থানে স্থাপিত এই ভাস্কর্যটি এখন থেকে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং ওয়েলসের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হবে।
গত শনিবার ( ১১ জুলাই) দুপুর ১২টায় সাবেক মন্ত্রী জেইন এলিজাবেথ হাটের সঞ্চালনায় আয়োজিত ভাস্কর্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে রাজনীতিবিদ, রডরি মর্গানের পরিবারের সদস্য, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং শত শত সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ওয়েলসের পার্লামেন্টের ডেপুটি ফার্স্ট মিনিস্টার সিওনেড উইলিয়ামস, সাবেক ফার্স্ট মিনিস্টার মার্ক ড্রেকফোর্ড, ফাইন্যান্স মিনিস্টার এলিন জোন্স, রডরি মর্গানের স্ত্রী জুলি মর্গান, সেনেড সদস্য হিউ টমাস, লেবার এমএস শাভ, হিউ ইরাঙ্কা-ডেভিস, কার্ডিফের লর্ড মেয়র রাইট অনারেবল মাইকেল মাইকেল এবং রডরি মর্গান ট্রাস্টের অন্যতম ফাউন্ডার্স ট্রাস্টি কাউন্সিলর দিলওয়ার আলী।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি কমিউনিটির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন গ্রেটার সিলেট কমিউনিটি ইউকের কেন্দ্রীয় কনভেনর মোহাম্মদ মকিস মনসুর, ওয়েলস বাংলাদেশ উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাহমিনা খান, লেখক ও সাংবাদিক দেওয়াল ফয়সাল, সৈয়দ জুয়েল রহমান, ভিপি সেলিম আহমেদ, আবুল কালাম মুমিনসহ কমিউনিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
পিয়ারহেড বিল্ডিংয়ের সামনে স্থাপিত ভাস্কর্যে রডরি মর্গানকে তাঁর প্রিয় কুকুর ‘টেল’-এর সঙ্গে সেনেড ভবনের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। সাধারণ পোশাকে, মাটির সমতলে স্থাপিত এই ভাস্কর্য তাঁর জনঘনিষ্ঠ ও আড়ম্বরহীন রাজনৈতিক জীবনের প্রতিচ্ছবি।
রডরি মর্গানের স্ত্রী জুলি মর্গান বলেন, “মূর্তিটি কোনো উঁচু মঞ্চে নয়, বরং মানুষের কাছাকাছি মাটির ওপর স্থাপন করা হয়েছে, কারণ তিনিও ছিলেন মানুষের খুব কাছের একজন নেতা।”
সাবেক ফার্স্ট মিনিস্টার মার্ক ড্রেকফোর্ড বলেন, “রডরি মর্গান ছিলেন ডিভলিউশনের জনক। তাঁর নেতৃত্ব ছাড়া সেনেড আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পারত না।”
ডেপুটি ফার্স্ট মিনিস্টার সিওনেড উইলিয়ামস বলেন, “ওয়েলশ ডিভলিউশনের শুরুর অস্থির সময়কে স্থিতিশীল করতে রডরি মর্গান অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি টানা নয় বছর ফার্স্ট মিনিস্টারের দায়িত্ব পালন করেন।”
ফাইন্যান্স মিনিস্টার এলিন জোন্স দিনটিকে ওয়েলস ও মর্গান পরিবারের জন্য ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেন। লেবার এমএস শাভ তাঁকে “শ্রমজীবী মানুষ ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের প্রকৃত বন্ধু” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অন্যদিকে হিউ ইরাঙ্কা-ডেভিস বলেন, “যারা কখনো তাঁর সঙ্গে দেখা করেননি, তারাও তাঁকে যেন নিজের একজন বন্ধু হিসেবেই অনুভব করতেন।”
রডরি মর্গান ট্রাস্টের ফাউন্ডার্স ট্রাস্টি কাউন্সিলর দিলওয়ার আলী জানান, দীর্ঘ আট বছরের পরিকল্পনা, ছোট ছোট অনুষ্ঠান, নৈশভোজ এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অনুদানের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে এই ভাস্কর্য নির্মাণ সম্ভব হয়েছে।
ইউকে বিডি টিভির চেয়ারম্যান ও ওয়েলস বাংলা নিউজের সম্পাদক মোহাম্মদ মকিস মনসুর বলেন, “বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে রডরি মর্গানের ছিল গভীর আত্মিক সম্পর্ক। তিনি আজীবন সাধারণ মানুষের জন্য নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন।”
ওয়েলস বাংলাদেশ উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাহমিনা খান বলেন, “তিনি সবাইকে সমানভাবে মূল্যায়ন করতেন। তাঁর এই ভাস্কর্য কার্ডিফ বে-এর সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করবে।”
লেখক ও সাংবাদিক দেওয়াল ফয়সাল বলেন, “রডরি মর্গান ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল একজন মানুষ। মানুষ তাঁকে দেখলেই কথা বলতে এগিয়ে আসত, যা তাঁর জনপ্রিয়তারই প্রমাণ।”
ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাস্কর অ্যান্ডি এডওয়ার্ডস। তিনি এর আগে বিটলস ব্যান্ডের চার সদস্য, মোটরহেডের লেমি এবং ১৯১৪ সালের বিখ্যাত ‘ক্রিসমাস ট্রুস’ স্মারকসহ ৫০টিরও বেশি ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন। ভাস্কর্যটি তৈরি করা হয়েছে পাউইসের ক্যাসল ফাইন আর্টস ফাউন্ড্রিতে।
উল্লেখ্য, রডরি মর্গান ১৯৮৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। ১৯৯৯ সালে তিনি নতুন গঠিত ওয়েলস অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে ওয়েলসের স্বতন্ত্র নীতি ও রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে ওঠে। ‘ক্লিয়ার রেড ওয়াটার’ নীতির মাধ্যমে তিনি ওয়েলসকে যুক্তরাজ্যের অন্যান্য অংশ থেকে আলাদা নীতিগত অবস্থান গ্রহণে উৎসাহিত করেন।
২০১৭ সালে মৃত্যুবরণকারী রডরি মর্গানকে তাঁর সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০১১ সালে রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, এই ভাস্কর্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রডরি মর্গানের অবদান স্মরণ করিয়ে দেবে এবং নতুন প্রজন্মকে জনসেবা ও রাজনীতিতে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করবে।


















