বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি সুস্পষ্ট ও একপাক্ষিক রাজনৈতিক বয়ান লক্ষ করা যায়।
এসব প্রতিবেদনে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্থানকে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
বিশেষ করে বিজেপিপন্থি সংবাদমাধ্যম ফার্স্টপোস্টের সম্পাদক পালকি শর্মা, পাশাপাশি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, আনন্দবাজার পত্রিকা ও রিপাবলিক বাংলা—এই চারটি গণমাধ্যম জামায়াতকে এমনভাবে উপস্থাপন করছে, যেন দলটি বাংলাদেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে নির্বাচন পেছাতে চায়।
জনসমর্থন আড়াল করে ‘উগ্রবাদ’ তকমা
ফার্স্টপোস্টে পালকি শর্মার বিশ্লেষণে দাবি করা হয়, জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকায় জামায়াত এখন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নেই—এমন অভিযোগ তুলছে। অথচ একই সময়ে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির পরপর পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় অর্জন করলেও ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো এই জনসমর্থনের বিষয়টি প্রায় সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে। বরং এসব বিজয়কে তারা ‘র্যাডিক্যালাইজেশন’ বা ‘উগ্রবাদের বিস্তার’ হিসেবে চিহ্নিত করছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, যেন দলটি নির্বাচনের আগেই পরাজয় স্বীকার করে প্রশাসনকে দায়ী করছে। বাস্তবে জামায়াত প্রশাসনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা একটি বিশেষ দলের অনুসারীদের সরিয়ে পূর্ণ নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগের এক অধ্যাপক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন,“বাংলাদেশের চব্বিশের অভ্যুত্থান ছিল পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন ধারার সূচনা। কিন্তু ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী মিডিয়া আবার সেই পুরোনো একাত্তরকেন্দ্রিক ন্যারেটিভেই ফিরে যাচ্ছে।” বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার অভিযোগ
ভারতীয় গণমাধ্যমের এই প্রচারণার আরও গভীর উদাহরণ পাওয়া যায় বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে।
যশোরে রানা প্রতাপ বৈরাগী হত্যাকাণ্ডকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও আনন্দবাজার এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, যেন এটি একটি পরিকল্পিত হিন্দু নিধনযজ্ঞ।
অথচ বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উঠে আসে, তিনি একসময় চরমপন্থি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ছিল।
তবুও ভারতীয় গণমাধ্যম এসব ঘটনায় সরাসরি জামায়াত বা কট্টরপন্থিদের দায়ী করছে। রিপাবলিক বাংলার মতো চ্যানেলগুলো বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের বিজয়কেও ‘ইসলামী বিপ্লব’ আখ্যা দিয়ে ভারতের দর্শকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিবিষয়ক কূটনীতিক রিয়াজ আহমেদ বলেন,“আওয়ামী লীগের পতনের পর দিল্লি বাংলাদেশে তাদের হারানো প্রভাব পুনরুদ্ধারে মরিয়া। তারা বিএনপিকে মিত্র হিসেবে দেখতে চায়, কিন্তু জামায়াত তাদের কাছে বরাবরই ‘রেড লাইন’।” তার মতে, মিডিয়ার মাধ্যমে জামায়াতকে দানবীয়ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে বিএনপি বাধ্য হয়ে তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখে।
অন্যদিকে বিবিসি ও আলজাজিরার মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ভারতীয় মিডিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নিয়েছে। বিবিসি জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখিয়েছে।
আলজাজিরা তুলে ধরেছে, গত দেড় দশকের দমন-পীড়নের ফলে জামায়াতের প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই মূল শর্ত—যেখানে ভারতীয় গণমাধ্যম জামায়াতকে প্রক্রিয়ার বাইরে রাখতে চায়।
কূটনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকায় উপস্থিতি ও খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানানো স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়—ভারত এখন বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। তবে অলিখিত শর্ত হলো, বিএনপিকে অবশ্যই জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে জামায়াতকে ‘পাকিস্তানপন্থি’ ও ‘ভারতবিরোধী’ শক্তি হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে, যাতে আন্তর্জাতিক মহলে দলটি গ্রহণযোগ্যতা না পায়।
বিশ্লেষকদের মতে, একাত্তরের প্রশ্নকে সামনে এনে জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে করা এবং তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ‘উগ্রবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করাই এখন ভারতীয় মিডিয়ার প্রধান এজেন্ডা।
কূটনৈতিক মহল সতর্ক করে বলছে, এ ধরনের প্রচারণা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং বাংলাদেশে ভারতবিরোধী জনমত আরও জোরালো হতে পারে।


















