স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ পাশ কাটিয়ে বাস্তবায়নের সুপারিশ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। দলটির দাবি, সনদে থাকা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (অসন্তোষের নোট) বাস্তবায়নের সুপারিশে বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে বিএনপি বলছে, ঐকমত্য কমিশন আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসি ও ইয়াহিয়া খানের লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের (এলএফও) ধাঁচে কাজ করছে।
বিএনপি অভিযোগ করেছে, গণভোটের সময়কাল ও সুপারিশ প্রক্রিয়ায় কিছু রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দিতে ‘জনগণের সঙ্গে প্রতারণা’ করা হয়েছে।
দলটির নেতারা বলছেন, ৮৫টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট থাকা ২৬টি বিষয় উপেক্ষা করা হয়েছে।
এসবের মধ্যে রয়েছে—
• উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা (PR)
• প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান একই ব্যক্তি না থাকা
• চারটি সাংবিধানিক পদে (দুদক, পিএসসি, ন্যায়পাল, সিএজি) স্পিকারের মাধ্যমে নিয়োগ
• সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের সমর্থন বাধ্যতামূলক করা
• জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ
বিএনপি মনে করে, এসব বিষয় বাদ দিয়ে কমিশন সরকারের অনুকূলে রিপোর্ট দিয়েছে।
ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন,
“আমরা সরকারের কাছে সুপারিশ দিয়েছি। এখন গ্রহণ করা বা না করা সরকারের এখতিয়ার।”
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে এসব প্রস্তাব জনগণের কাছে নিতে পারে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,
“নোট অব ডিসেন্ট পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এটা ঐক্য নয়, প্রতারণা।”
তিনি অন্তর্বর্তী সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
“আপনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—সংস্কার শেষ করে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেবেন। তা না হলে দায়ভার আপনাকেই নিতে হবে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন,
“ঐকমত্য কমিশন রেফারির ভূমিকায় থেকে নিজেই গোল দিয়েছে। কমিশন ও সরকার একই দলে খেলছে।”
স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিএনপি কমিশনকে ‘অনৈক্য কমিশন’ আখ্যা দেয়।
সরকারের তরফে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন,“প্রতিবেদন উপদেষ্টা পরিষদে উপস্থাপন করা হবে। সিদ্ধান্ত এলে জানানো হবে।”
ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ মন্তব্য করেন,
“বিএনপির অবস্থান তাদের রাজনৈতিক বিষয়, আমরা কোনো মন্তব্য করতে চাই না।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর এম মাহবুব উল্লাহ বলেন,
“সরকার ও দলগুলোর মুখোমুখি অবস্থান দেশের জন্য অশনিসংকেত। অনৈক্য বজায় থাকলে ফ্যাসিস্ট শক্তি ফের মাথাচাড়া দিতে পারে।”
তিনি দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
রাষ্ট্র সংস্কার বিষয়ক জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হয় ১৭ অক্টোবর। এনসিপি ছাড়া জুলাই আন্দোলনের প্রায় সব দল এতে সই করে। ঐকমত্য কমিশন এর পর ৮৫ দফা বাস্তবায়ন প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়—
• ৯টি নির্বাহী আদেশে,
• ২৮টি আইন প্রণয়ন/সংশোধন করে,
• সংবিধান সংশোধনের ৪৮টি বিষয়ে দুটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে।
• গণভোটের সময় নির্ধারণ সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বিএনপি চায় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হোক, অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি চায় নভেম্বরেই গণভোট।
এক সময় সংস্কার ও নির্বাচনে ঐকমত্যের পথে থাকা সরকার ও বিএনপি আবারও মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ সংঘাত মীমাংসা না হলে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়তে পারে।


















