মোবাশ্বের নেছারী, কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা :
উজানের ঢল ও টানা ভারী বৃষ্টিতে উত্তরাঞ্চলে আবারও বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও রংপুর জেলার নিম্নাঞ্চলে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
এদিকে সাম্প্রতিক বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে কুড়িগ্রামের কৃষি খাতে প্রায় ৩১৪ কোটি ৮১ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশ করেছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। জেলার ৯ উপজেলায় ২ হাজার ৭৫২ জন কৃষকের প্রায় ৪৯৯ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫০ হেক্টরের ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে।
সোমবার (১৩ জুলাই) সকালে পাউবোর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বেড়েছে। তিস্তা নদীর পানি রংপুরের কাউনিয়া পয়েন্টে সতর্কসীমায় পৌঁছে বিপৎসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। অন্য নদীগুলোর পানিও বৃদ্ধি পেলেও এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং ভারতের মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর প্রভাবে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে কিছু স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। ফলে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তবে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় পানি কমতে পারে বলেও পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাউবোর কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “জেলার নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার পূর্বাভাস রয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের যেসব অংশ দুর্বল রয়েছে, সেগুলো দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে।”
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি খরিপ মৌসুমে জেলায় ৩২ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফসলের আবাদ করা হয়েছিল। বৈরী আবহাওয়ায় ৪৯৯ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৭৪৪ দশমিক ৭২ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পটল, জালি কুমড়া, লাউ, কাঁকরোল, চিচিঙ্গা, বেগুন, মরিচ, করলা ও শসার আবাদ।
রাজারহাট উপজেলার ঘরিয়ালডাঙা ইউনিয়নের কৃষক তাহেরুল ইসলাম বলেন, “অনেক কষ্ট করে থিম ও পটলের চাষ করেছিলাম। বৃষ্টি আর বন্যার পানিতে সব শেষ হয়ে গেছে।”
একই এলাকার কৃষক নুরআলম বলেন, “প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করে বিভিন্ন ধরনের সবজি আবাদ করেছিলাম। অর্ধেক বিক্রি করতে পারলেও বাকি ফসল পানিতে নষ্ট হয়েছে। এবার বড় লোকসান গুনতে হবে।”
চিলমারী উপজেলার কৃষক নওশাদ আলী বলেন, “আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। সরকার সহযোগিতা করলে আবার নতুন করে চাষাবাদ শুরু করতে পারব।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) কৃষিবিদ মেহেদী হাসান বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। সরকারিভাবে সহায়তা এলে দ্রুত কৃষকদের মধ্যে তা বিতরণ করা হবে।”
নদীর পানি বৃদ্ধি এবং নতুন করে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসে কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলের নদী তীরবর্তী মানুষের মধ্যে আবারও বন্যা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, পানি আরও বাড়লে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বর্তমান হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।


















