মোবাশ্বের নেছারী, কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা :
উজানের পাহাড়ি ঢল আর টানা বর্ষণে কুড়িগ্রামে বন্যা ও নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জেলার ১৬টি নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকায় দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
নাগেশ্বরীর মুড়িয়ারহাট এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে জেলার পাঁচটি প্রধান নদীর আগ্রাসী ভাঙনে প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গ্রামীণ সড়ক।
সোমবার (২৯ জুন) কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৯টায় দুধকুমার নদীর পানি পাটেশ্বরী পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
ধরলা নদীর পানি কুড়িগ্রাম পয়েন্টে বিপৎসীমার ৪৮ সেন্টিমিটার নিচে, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে ৮৫ সেন্টিমিটার এবং চিলমারী পয়েন্টে ৬৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার মাত্র ২ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। উজানে ভারতের দোমুহুনি ও গজলডোবা পয়েন্টে পানি বাড়তে থাকায় কুড়িগ্রামের নদ-নদীতেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
নাগেশ্বরী উপজেলার দুধকুমার নদের মুড়িয়ারহাট এলাকার বেড়িবাঁধে কয়েকদিন ধরেই ধস দেখা দেয়। সময়মতো সংস্কার না হওয়ায় রোববার বিকেলে বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যায়। এরপর নদীর পানি দ্রুত লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মিয়াপাড়া, মালিয়ানি, সেনপাড়া, তেলিয়ানীপাড়া, পাটেশ্বরী, বোয়ালের ডারা, ধনিটারী, বড়মানীসহ অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আবদুল মান্নান বলেন, “মিয়াপাড়া ও মুড়িয়ারহাট এলাকায় বাঁধ ভেঙে এবং কয়েকটি স্থানে উপচে পানি ঢুকছে। এতে ইউনিয়নের চারটি ওয়ার্ডের প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।”
এদিকে বন্যার পানিতে কুড়িগ্রাম সদর, নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী ও রৌমারী উপজেলার অন্তত ২০৪ হেক্টর জমির আমন বীজতলা, পাট, বাদাম ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির ক্ষেত তলিয়ে গেছে। নিচু এলাকার ঘরবাড়িতেও পানি প্রবেশ করায় দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ।
অন্যদিকে জেলার ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও কালজানি নদীর ৩৬টি পয়েন্টে প্রায় ১১ দশমিক ২৪৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র নদীভাঙন চলছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, ইতোমধ্যে প্রায় ৫০০ পরিবার বসতভিটা হারিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। নদীপাড়ের মানুষ ঘরের টিন খুলে রেখে রাত জেগে ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টির কারণে জেলার সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। দুধকুমার নদী বর্তমানে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের একটি নিচু সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সেখান দিয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জিওব্যাগ ফেলে জরুরি প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ. এম. খোদাদাদ হোসেন বলেন, “বাঁধ ভাঙার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাউবোকে জানানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে জরুরি মেরামতের কাজ শুরু করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।”
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানান, বন্যাকবলিত মানুষের জন্য দুই লাখ টাকা, ১১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ভাঙন প্রতিরোধে প্রতিটি উপজেলার জন্য এক হাজার করে জিওব্যাগ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এদিকে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ জানিয়েছে, বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ইতোমধ্যে ২৭৫ মেট্রিক টন চাল, ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা এবং এক হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরির কাজও চলছে।
আবহাওয়া ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পূর্বাভাস বলছে, উজানে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েকদিনে কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। নদীপাড়ের মানুষের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এবারও শত শত পরিবার তাদের শেষ সম্বল হারাবে।


















