ম. ম. রবি ডাকুয়া, বাগেরহাট সংবাদদাতা :
শিকারিদের পাতা ফাঁদে গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা সুন্দরবনের সেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাঘিনীকে পাঁচ মাসের নিবিড় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন শেষে আবারও বনের স্বাভাবিক পরিবেশে অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বন বিভাগ। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি জুন মাসের শেষ সপ্তাহেই তাকে সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের সরকির খাল এলাকায় শিকারিদের পেতে রাখা একটি প্রাণঘাতী ছিটকা ফাঁদে আটকা পড়ে বাঘিনীটি। পরদিন ৪ জানুয়ারি বন বিভাগের বিশেষ উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থল থেকে তাকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যায়।
উদ্ধারের সময় বাঘিনীটির শারীরিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। তার সামনের বাম পায়ের প্রায় তিন ইঞ্চি অংশের চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ফাঁদে আটকে থাকায় ক্ষতস্থানে পচনও ধরেছিল।
পরবর্তীতে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা। নিয়মিত ড্রেসিং, অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ ও নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে বাঘিনীটি। বর্তমানে তার ক্ষত সম্পূর্ণ সেরে গেছে এবং ক্ষতস্থানে নতুন পশমও গজিয়েছে।
বন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ফলে বাঘিনীটির ওজন বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে তার স্বাভাবিক ক্ষিপ্রতা, চলাফেরার সক্ষমতা এবং শিকার ধরার সহজাত প্রবৃত্তিও ফিরে এসেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজসহ বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বাঘিনীটির বয়স ৯ থেকে ১০ বছর উল্লেখ করে তাকে প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
বাঘিনীটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবমুক্তির আগে তার গলায় একটি স্যাটেলাইট কলার পরানো হবে। এর মাধ্যমে বন বিভাগ তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ব্যবহৃত এই বিশেষ প্রযুক্তির কলার নির্দিষ্ট সময় পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যাবে।
সুন্দরবন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. ইমরান আহমেদ জানান, বাঘিনীটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ এবং নিজে শিকার ধরে বনে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাই তাকে পুনরায় সুন্দরবনে অবমুক্ত করার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তবে বাঘিনীটির সফল পুনর্বাসন যেমন আশাব্যঞ্জক, তেমনি শিকারিদের তৎপরতা নতুন করে উদ্বেগও সৃষ্টি করেছে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে বনাঞ্চলে নজরদারি বৃদ্ধি, নিয়মিত টহল এবং শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
বন বিভাগের আশা, মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা এই বাঘিনীর সুন্দরবনে প্রত্যাবর্তন দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কার্যক্রমে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।


















