মোঃ ইব্রাহিম খলিল,সাতক্ষীরা সংবাদদাতাঃ
শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষকদের সৎ নীতি, ন্যায়পরায়ণতা, নৈতিকতা আর আদর্শ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। শিক্ষক যদি হয় দূর্নীতিগ্রস্ত, তা হলে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা তথা জাতি ভুলপথে ধাবিত হবেনা একথা অস্বীকার করার নয়।
কেননা শিক্ষকদের কাছ থেকে সুশিক্ষা এবং কুশিক্ষা শ্রবণ করার মধ্য দিয়ে একটি দেশের সমাজব্যবস্থায় ভালো, মন্দ নির্ভরশীল।
“স্বামী বিবেকানন্দ” বলেছেন, মানুষের অন্তর্নিহিত পরিপূর্ণ বিকাশ হলো শিক্ষা,আর তার পথপ্রদর্শক হলেন শিক্ষক। তাই শিক্ষা যদি হয় জাতির মেরুদণ্ড, তবে শিক্ষক হলেন সেই মেরুদণ্ড গড়ার প্রধান কারিগর। একজন শিক্ষকের ভূমিকা ব্যাতিত কোন জাতিই শিক্ষিত জাতিতে পরিণত হতে পারেনা।
এরই ধারাবাহিকতায় সাতক্ষীরা জেলা জুড়ে অনেক শিক্ষক আছে যারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বিভিন্ন দূর্নীতির সাথে জড়িত। সেকারণে অধিকাংশ ছাত্র, ছাত্রীদের অভিভাবক থেকে শুরু করে সচেতন মহল তথা সুশীল সমাজের ব্যক্তিরা স্কুলের পাঠদানের সুশিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অনেকেই মনে করেন, শিক্ষকরা দূর্নীতিগ্রস্ত হলে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দূর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে। এর ব্যাতিক্রম ঘটেনি সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আনিছুর রহমান কে নিয়ে। কোচিং বাণিজ্য, নিম্নমানের টিফিন থেকে শুরু করে, বিধিবহির্ভূত ভাবে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পরিচয় প্রকাশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বৈরাচারী মনোভাব সহ পাহাড়সম অপরাধে নিজের নাম লিখিয়েছেন।
দীর্ঘদিন যাবত সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদ শুন্য থাকায় ত্বদীয় স্থলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন আনিছুর রহমান। জানা গেছে, তিনি একাধারে সহকারী প্রধান শিক্ষকের (চলতি দায়িত্ব) পালন করছেন, আবার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় আনিছুর রহমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বও পালন করছেন।

একসাথে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট হিমসিম খাচ্ছেন আনিছুর রহমান। ফলে বিদ্যালয়ের পাঠদান থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতায় যথেষ্ঠ বিঘ্ন ঘটছে। আনিছুর রহমান এর মূল পদ সিনিয়র শিক্ষক, তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হওয়ায় অন্যান্য সিনিয়র শিক্ষকরা তার নির্দেশনা আন্তরিকভাবে পালন করতে পারছেন না। সে কারণে বিদ্যালয়ের চেইন অফ কমান্ড ভেঙে পড়েছে।
খোজ নিয়ে জানা গেছে, ঐ বিদ্যালয়ে ১৫ জনের অধিক সিনিয়র শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। সেকারণে অনেক সিনিয়র শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তথা মুল পদ সিনিয়র শিক্ষক আনিছুর রহমান এর নির্দেশনা মানছেনা। এতে বিদ্যালয়ের চেইন অফ কমান্ড অনেকাংশেই শোচনীয় আকার ধারণ করার পাশাপাশি ভেঙে পড়েছে বিদ্যালয়ের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা।
অনেক অভিভাবক মনে করেন, দীর্ঘদিন যাবত প্রধান শিক্ষক পদ শুন্য থাকায় ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা। তাদের মতে প্রধান শিক্ষক পদ পূরণ হলে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব হবে।
অভিযোগ আছে, সম্প্রতি সময় মোঃ আনিছুর রহমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পরিবর্তে লিখিত ও মৌখিকভাবে প্রধান শিক্ষকের পরিচয় সরাসরি প্রকাশ ও ব্যবহার করছেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ) উপলক্ষে বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠানের ব্যানারে সাতক্ষীরার নবাগত জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদ প্রধান অতিথি ছিলেন।
সেই অনুষ্ঠানের ব্যানারেও মোঃ আনিছুর রহমান নিজেকে প্রধান শিক্ষকের পরিচয় প্রকাশ ও ব্যবহার করেছেন। এছাড়া সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে
“আন্তঃশ্রেনী বিতর্ক প্রতিযোগিতা ২০২৪” এর চুড়ান্ত সময় সুচিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আনিছুর রহমান প্রধান শিক্ষক পরিচয় প্রকাশ এবং প্রধান শিক্ষক না হয়েও প্রধান শিক্ষক হিসেবে সাক্ষর করেছেন। 
বিদ্যালয়ের বিভিন্ন নোটিশে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে পরিচয় প্রকাশ সহ সাক্ষরের জায়গায় তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক না লিখে প্রধান শিক্ষকের সাক্ষর করেছেন। কারন হিসেবে জানা যায়, সরকার যেনো সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে কোন প্রধান শিক্ষক পদায়ন না করেন। একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হয়ে কিভাবে তিনি প্রধান শিক্ষকের পরিচয় প্রদান করেন তা বলাই বাহুল্য।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমন অপকর্ম, দূর্নীতি এবং বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছেন কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারী থেকে শুরু করে অভিভাবক ও তরুণ শিক্ষার্থীরা। অভিযোগ উঠেছে, বিদ্যালয়ের বর্তমান টিফিনের মান খুবই নিম্নমানের। টিফিন নিম্নমানের হওয়ায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ এবং উত্তেজনা বিরাজ করছে।
বিদ্যালয়ের ০১ নং ভবনের দোতলায় মেয়েদের জন্য গার্লস ফ্যাসেলিটিজ জোন আছে সেটা ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বিদ্যালয় হোস্টেলের নিচতলার দুটি রুমে প্রভাতি শিফটের সিনিয়র শিক্ষক, রাধন কুমার আইচ প্রাইভেট পড়িয়ে মাসে এক লাখের বেশি টাকা উপার্জন করেন। তিনি প্রভাতী শিফটের শিক্ষক হয়ে দিবা শিফটের ছাত্রীদের “সরকারি” বাধ্যতামূলক ক্লাস করা থেকে বঞ্চিত করে হোস্টেলের নিচতলায় প্রাইভেট টিউশনি করেন।
জানা গেছে, প্রাইভেট পড়ানোর টাকার একটা বড় অংশ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পকেটে যায়। ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে (৬ষ্ঠ হতে ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত) বার্ষিক শিখনকালীন মূল্যায়নের (৩০%) যাবতীয় কার্যক্রম বার্ষিক পরীক্ষার শুরুর পূর্বেই সম্পন্ন করার নির্দেশনা আছে। নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বাধ্য করছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও তার সহযোগী শিক্ষক মোঃ আলা উদ্দিন, মোঃ রবিউল ইসলাম (ভুগোল), মোঃ হাবিবুল্লাহ, মোঃ আসাদুজ্জামান, হারাধন কুমার আইচ (শুভ), মোঃ উজাইর হেসেন।
অথচ বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। এমনও অভিযোগ রয়েছে যে কিছু শিক্ষক নিজেরাই বিস্তারিত না বুঝেই কিছু বিষয়ের অ্যাসাইনমেন্ট শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সেখানে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হচ্ছে, অন্যথায় জমা গ্রহণ করা হবেনা মর্মে শিক্ষার্থীদের জানান দেওয়া হয়।
এছাড়া রিপোর্ট লেখার জন্য “এ,ফোর” সাইজের অফসেট কাগজ ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের। উল্লেখিত শিক্ষকদের মধ্যে মোঃ উজায়ের হোসেন ছাড়া বাকিরা সবাই ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন। দীর্ঘদিন যাবত একই কর্মক্ষেত্রে কাজ করে তারা নিজেদের প্রভাব বিস্তার ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দিনকে দিন স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন যাবত সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য থাকার কারণে সহসাই অপকর্ম বেড়েই চলেছে। জরুরী ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষক পদায়ন হলে শিক্ষকদের মধ্যে মানসিক বৈষম্য দূর হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে পাঠদান এবং চেন অফ কমান্ড ফিরে আসবে। এমনটা মনে করেন অভিভাবক, সচেতন মহল সহ সুশীল সমাজের ব্যক্তিরা।
এ বিষয় সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মূল পদ “সিনিয়র শিক্ষক” আনিছুর রহমান এর সাথে মুঠোফোনে আলাপকালে তিনি বলেন, হতে পারে লেখা হয়েছে। এ সময় তার বিরুদ্ধে আনিত অন্যান্য অভিযোগের কথা তুলে ধরলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এ বিষয় সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি মোস্তাক আহমেদ এর সাথে সরাসরি আলাপকালে তিনি বলেন, অতি দ্রুত সাতক্ষীরা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক আনা হবে। আনিছুর রহমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হয়েও প্রধান শিক্ষক পরিচয় প্রকাশ, কোচিং বাণিজ্য সহ অন্যান্য দূর্নীতির ব্যাপারে তিনি বলেন, তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
















