রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি পদে তার নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হতে পারে। তবে মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদ থেকে তাকে পদত্যাগ করতে হবে। একই সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব পদেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা। জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি হওয়ায় দলটির মনোনীত প্রার্থীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বৈঠক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।
তবে রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। ফলে এখন শীর্ষ নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে দলীয় নেতাকর্মীরা।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম জোরালোভাবে আলোচনায় আসার মধ্যেই মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। তাকে শুভেচ্ছা জানাতে আসেন অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী। তারা মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে অভিনন্দন জানানোর চেষ্টা করেন।
তবে এ বিষয়ে মির্জা ফখরুলকে খুব একটা উৎসাহী মনে হয়নি। শুভেচ্ছা জানাতে আসা ব্যক্তিদের উদ্দেশে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আগে হোক, তারপর।’ এরপরও তিনি সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত সচিবালয়ে অফিস করার পর তিনি বেইলি রোডের সরকারি বাসভবনে যান। সেখানেও সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপস্থিতি ছিল।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ভোটগ্রহণ হবে ২০ আগস্ট। ওই দিন জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার হিসেবে রয়েছেন জাতীয় সংসদের ৩৪৯ জন সদস্য। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এ পদ্ধতি চালু হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটের বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদও গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য সংসদে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার রাজনৈতিক সুযোগ কার্যত সীমিত।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মির্জা ফখরুলের পাশাপাশি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ড. আবদুল মঈন খানের নামও আলোচনায় এসেছে। তবে শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুলের নামই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। গত ১ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়। বৈঠক শেষে মির্জা ফখরুল নিজেই সাংবাদিকদের বিষয়টি জানিয়েছিলেন।
দলের ভেতরে তার নাম গুরুত্ব পাওয়ার পেছনে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকেই বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে এক দশকের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ মির্জা ফখরুল একই সঙ্গে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করছেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময় মির্জা ফখরুল সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলের নানা প্রতিকূলতার সময় তিনি নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন। পরে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বেও বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সজ্জন ও সংযত রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও মির্জা ফখরুলের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। ২০১১ সালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলের পর থেকে তিনি দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
নিজের সম্ভাব্য মনোনয়ন নিয়ে অবশ্য এখনো সরাসরি কিছু বলেননি মির্জা ফখরুল। গতকাল বিকেলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে এই মুহূর্তে কিছুই বলার নেই। ১৩ আগস্টের পর দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে। তিনি বলেন, বিষয়টি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। লুকোচুরির বিষয় নেই। দলের সর্বোচ্চ ফোরামের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর বা সম্মতি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, মনোনয়ন ফরম তুলতে স্বাক্ষর বা সম্মতির প্রয়োজন নেই। স্বাক্ষরের বিষয়টি রয়েছে মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে অতিউৎসাহী হয়ে অনেক কিছু লেখা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যানের ওপর দেওয়া হয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম বেশি আলোচনায় রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চেয়ারম্যানই নেবেন।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে দলের অভ্যন্তরে এবং স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা চলছে। প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আরও আলোচনা হবে।
তবে দলীয় সূত্র, রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনা এবং মির্জা ফখরুলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে তার নামই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত। শেষ পর্যন্ত তার মনোনয়ন চূড়ান্ত হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তনের পাশাপাশি বিএনপির মহাসচিব পদেও নতুন মুখ আসতে পারে। এখন সবার নজর বৃহস্পতিবারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দিকে।


















