একসময় বিসিএসে ক্যাডার হওয়ার কোনো স্বপ্নই ছিল না ওমর ফারুকের। পড়াশোনা শেষ করে একটি চাকরি নিয়ে স্বাভাবিক জীবন কাটিয়ে দেওয়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য। কিন্তু করোনা মহামারির সময় বাবার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন—ছেলেকে একজন বড় সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দেখার আকাঙ্ক্ষা—তাঁর নিজের স্বপ্নে পরিণত হয়।
সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও নিয়মিত প্রস্তুতির মাধ্যমে প্রথম চেষ্টাতেই অর্জন করেন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। এরপর পরপর দুই বিসিএসে কৃতিত্ব দেখিয়ে ৪৬তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডার এবং ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক।
মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের মোল্লাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা ওমর ফারুক ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে মাভাবিপ্রবির সিএসই বিভাগে ভর্তি হন। এর আগে তিনি ২০১৫ সালে নিজ জেলার একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরিবারে বাবা-মা ও এক বোন রয়েছেন।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে ওমর ফারুক বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, অনুভূতিটা ভাষায় পুরোপুরি প্রকাশ করা কঠিন। আমি খুবই আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ। তবে এই অর্জনকে আমি কোনো গন্তব্য হিসেবে দেখি না, বরং এটি একটি বড় দায়িত্বের শুরু। পরিবার, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অবদান ছাড়া এই সাফল্য সম্ভব হতো না। একজন ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে সততা, পেশাদারিত্ব ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে চাই।”
বিসিএস প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের প্রথম সেমিস্টার থেকেই নিয়মিত পড়াশোনা শুরু করেন। প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও তিনি কখনো অতিরিক্ত সময়ের পেছনে না ছুটে ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “অনেকে ১৪-১৫ ঘণ্টা পড়াশোনা করেন, আমি তাদের সম্মান করি। তবে আমার পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। আমি নিয়মিত পড়েছি, আর সেই ধারাবাহিকতাই আমাকে সফল করেছে।”
প্রস্তুতির সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল চারপাশের ব্যর্থতার গল্প। তিনি বলেন, “অনেক সময় মনে হতো, এত মানুষ বারবার চেষ্টা করেও সফল হচ্ছে না, আমি কি প্রথমবারেই পারব? কিন্তু নিজের ওপর বিশ্বাস হারাইনি। সেই আত্মবিশ্বাসই আমাকে এগিয়ে নিয়েছে।”
ওমর ফারুক জানান, তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা বাবা-মা, বিশেষ করে বাবার অগাধ বিশ্বাস ও উৎসাহ তাঁকে স্বপ্নপূরণে সাহস জুগিয়েছে।
ভবিষ্যতে কোন ক্যাডারে যোগ দেবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেইনি। যেহেতু প্রশাসন ক্যাডারে আগে যোগদানের সুযোগ হবে, তাই সেখানে যোগ দেব। এরপর পরিস্থিতি বিবেচনা করে পুলিশ ক্যাডার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব।”
সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী সততা, নিরপেক্ষতা এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে জনগণের সেবা করাই তাঁর মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি সরকারি সেবাকে আরও সহজ, কার্যকর ও জনবান্ধব করা, সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কমানো এবং সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে কাজ করতে চান।
বিসিএস প্রত্যাশীদের উদ্দেশে ওমর ফারুকের পরামর্শ, বিসিএসকে দীর্ঘমেয়াদি ও নিয়মতান্ত্রিক প্রস্তুতির পরীক্ষা হিসেবে দেখতে হবে। শর্টকাটের ওপর নির্ভর না করে সিলেবাসভিত্তিক পড়াশোনা, নিয়মিত অনুশীলন এবং সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে সচেতন থাকার পাশাপাশি ব্যর্থতায় হতাশ না হয়ে নিজের দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে নতুন উদ্যমে প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হবে। তাঁর মতে, বিসিএস জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়; বরং একজন দক্ষ, সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পরপর দুই বিসিএসে প্রশাসন ও পুলিশ—দেশের দুটি মর্যাদাপূর্ণ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে ওমর ফারুক এখন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর এই সাফল্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবই বাড়ায়নি, নতুন প্রজন্মের বিসিএস প্রত্যাশীদের মাঝেও আত্মবিশ্বাস ও স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছে।


















