মোবাশ্বের নেছারী, কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা :
কাঁটাতারের বেড়ার এক পাশে বাংলাদেশ, অন্য পাশে ভারতের সীমান্তরক্ষীদের কড়া পাহারা। মাঝখানের আন্তর্জাতিক শূন্যরেখায় টানা ৭২ ঘণ্টা ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন ৯ বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে রয়েছে দুই শিশু—একজনের বয়স মাত্র ছয় মাস।
ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রোদ-বৃষ্টি আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে দিন পার করছেন তারা। শিশুদের কান্না আর মায়েদের অসহায় চাহনি এখন কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্ত এলাকার হৃদয়বিদারক দৃশ্য হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানায়, রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া ও ভন্দুরচর সীমান্তের আন্তর্জাতিক শূন্যরেখায় আটকে পড়া এসব বাংলাদেশিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) পুশইনের চেষ্টা করে। তবে বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধার কারণে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেননি।
মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, সামান্য প্লাস্টিক টানিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। নেই পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানি কিংবা স্যানিটেশনের ব্যবস্থা। তীব্র রোদে শিশুরা কষ্ট পাচ্ছে, আবার বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপছে।
ছয় মাস বয়সী কন্যা সুমাইয়াকে বুকে নিয়ে বসে থাকা সুমি আক্তার বলেন, “বাচ্চাগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে। ছোট মেয়েটা শুধু বুকের দুধ খায়। রোদে পুড়ছে, বৃষ্টিতে ভিজছে। আমরা শুধু চাই, সন্তানরা নিরাপদে থাকুক।”
তার স্বামী বিল্লাল হোসেন বলেন, “আমরা কোনো অপরাধ করিনি। দুই দেশের মাঝখানে পড়ে গেছি। সন্তানদের কষ্ট দেখে খুব কষ্ট হচ্ছে।”
জানা গেছে, গত রোববার সকালে গয়টাপাড়া সীমান্ত দিয়ে এক নারী, তিন পুরুষ ও দুই শিশুসহ ছয়জন এবং ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে আরও তিনজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। পরে তারা আন্তর্জাতিক শূন্যরেখায় অবস্থান নেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, তারা ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বাসিন্দা। কাজের সন্ধানে দালালের মাধ্যমে ভারতে যাওয়ার পর বিএসএফ তাদের আটক করে সীমান্তে নিয়ে আসে।
এদিকে স্থানীয়রা মানবিক কারণে তাদের খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা লিটন মিয়া বলেন, “দুই শিশুর অবস্থা দেখে খুব কষ্ট লাগে। দ্রুত তাদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া দরকার।”
বিজিবির এক সদস্য জানান, মানবিক বিবেচনায় তাদের খাবার, পানি ও ছাতা দেওয়া হয়েছে। শিশু দুটির দুর্ভোগ সবাইকে ব্যথিত করছে।
ঘটনার পর বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হলেও এখনো কোনো সমাধান হয়নি। উভয় পক্ষ নিজ নিজ অবস্থানে থাকায় ৯ বাংলাদেশির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে আছে।
জামালপুর-৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান জানান, বিষয়টির শান্তিপূর্ণ ও আইনগত সমাধানের জন্য আবারও পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়েছে।
কাঁটাতারের দুই পাশে দুই দেশ, আর মাঝখানে শূন্যরেখায় আটকে আছে ৯টি জীবন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কবে থামবে দুই শিশুর কান্না, কবে মিলবে তাদের নিরাপদ আশ্রয়।


















