নিজস্ব সংবাদদাতা :
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় সরকারি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি পৌর প্রশাসকের নির্দেশক্রমে পৌরসভার নোটিশ বোর্ডে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা টানানোর পর থেকেই পুরো উপজেলাজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃত কৃষকেরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হলেও তালিকায় নাম উঠেছে অকৃষক, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পৌর শহরের কামাল মিয়া, সাহেদ মিয়া তালুকদার, নাহিদ মিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সরেজমিনে মাঠে না গিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশে অফিসে বসেই এই তালিকা প্রস্তুত করেছেন। ফলে প্রকৃত কৃষকেরা বঞ্চিত হয়েছেন এবং নেতারা মনগড়ামতো নিজেদের আত্মীয়-স্বজন ও অকৃষকদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
ভরারগাঁওয় গ্রামের কৃষক তারেক মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হয়েও আবেদন করে তালিকায় নাম তুলতে পারেননি। অথচ অকৃষকদের নাম অনায়াসে তালিকায় চলে এসেছে।
তালিকা প্রকাশের পর পৌর বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক ভরারগাঁও গ্রামের হাজী বাচ্চু মিয়ার তিন ভাই (সুজাত মিয়া, আওরঙ্গজেব ও দারা মিয়া), সুজাত মিয়ার দুই ছেলে এবং আওরঙ্গজেবের স্ত্রীর নাম আসায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়।
তবে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, হাজী বাচ্চু মিয়া দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সাথে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। একটি কুচক্রী মহল রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, হাজী বাচ্চু মিয়ার ভাইয়েরা দীর্ঘদিন ধরে পৃথক পরিবার হিসেবে বসবাস করছেন এবং তারা সবাই মাঠের প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিজেদের সমালোচনা থেকে বাঁচাতে কোনো প্রকার সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি করে গতকাল ওই পরিবারের সদস্যদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন, যা প্রকৃত কৃষকদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে।
অনুসন্ধানে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের ভরারগাঁও গ্রামের কিছু ব্যক্তির নাম ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় এসেছে যারা মূলত কোনো কৃষিকাজের সাথেই জড়িত নন এবং তাদের কোনো ফসলি জমিও নেই। সরেজমিনে ও স্থানীয়দের তথ্যে জানা যায়, ৯নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুল হক (পিতা: হাসিদ উল্লাহ), মির্জা হোসেন (পিতা: আব্দুল গফুর), আবুল বক্কর চৌধুরী (পিতা: আবুল হোসেন), আবুল বশর চৌধুরী (পিতা: আবুল হোসেন চৌধুরী), সেলিম মিয়া (পিতা: মতি মিয়া) এবং সুহেল মিয়া (পিতা: মতি মিয়া)—তারা সবাই বিএনপি নেতা এবং কেউই প্রকৃত কৃষক নন বা এবার কোনো ক্ষতিগ্রস্ত হননি। জমি না থাকা সত্ত্বেও তাদের নাম তালিকায় আসায় স্থানীয়রা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে পুনরায় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, দিরাইয়ের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বাদল রায়ের নামে সরকারি কৃষি কার্ড থাকার বিষয়টি নিয়ে জনমনে নতুন করে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বাদল রায়ের বাড়ি সরর্মঙ্গল ইউনিয়নের কল্যাণী গ্রামে হলেও তিনি দিরাই বাজারের একজন প্রতিষ্ঠিত বড় ব্যবসায়ী স্বস্তী ভাণ্ডার নামে পরিচিত। যেখানে হাজার হাজার প্রকৃত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক একটি কৃষি কার্ডের জন্য বছরের পর বছর ঘুরছেন, সেখানে কৃষির সাথে দূরতম সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও একজন বড় ব্যবসায়ীর নামে কীভাবে কৃষি কার্ড ইস্যু হলো, তা নিয়ে সচেতন মহল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, কৃষি কার্ড প্রকৃত কৃষকদের অধিকার, প্রভাবশালীদের সুবিধা পাওয়ার মাধ্যম নয়। এর পেছনে জড়িত সিন্ডিকেটের মুখোশ উন্মোচন হওয়া দরকার।
সচেতন মহলের মতে, শুধু পৌরসভাই নয়, পুরো দিরাই উপজেলাজুড়েই চলছে কৃষক তালিকায় স্বজনপ্রীতির মহোৎসব। যাদের নাম তালিকায় থাকার কথা তাদের নাম নেই, আর যারা কৃষক নন, তাদের নাম অনায়াসে যুক্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আলী আজগরের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দিরাই পৌর প্রশাসক মো. জিয়াউল হাসান সৌরভ বলেন, “কৃষক তালিকা নিয়ে কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, কোনো রাজনৈতিক চাপ বা প্রতিহিংসার বশবর্তী না হয়ে, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে মাঠ পর্যায়ে পুনরায় তদন্ত করে অকৃষক ও প্রভাবশালীদের বাদ দিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক।


















