ম. ম. রবি ডাকুয়া, বাগেরহাট সংবাদদাতা :
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বর্তমানে অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন, বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার, প্লাস্টিক দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী চাপে চরম সংকটের মুখে পড়েছে।
পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানুষের সৃষ্ট নানা কর্মকাণ্ড সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনে লবণাক্ততা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। একই সঙ্গে রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্জ্য পশুর নদীসহ বনাঞ্চলের নদী-খালগুলোকে দূষিত করে তুলছে।
সরকারি সংস্থা সিইইজিএসের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পশুর নদীর পানিতে সিসা ও মার্কারির মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি সহনীয় মাত্রার তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি। গবেষকদের মতে, এই দূষিত পানি জলজ প্রাণীর প্রজনন ও স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত করছে। একই সঙ্গে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এসব বিষাক্ত উপাদান মানুষের শরীরেও প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
এছাড়া সুন্দরবনের অভ্যন্তরে জাহাজডুবি এবং নৌযান থেকে নির্গত তেল ও বর্জ্য প্রতিনিয়ত জলজ পরিবেশের ক্ষতি করছে। বিশেষ করে ডলফিনের অভয়াশ্রমসহ বিভিন্ন সংরক্ষিত এলাকা এর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় বনজীবী ও পরিবেশ গবেষকদের অভিযোগ, একটি অসাধু চক্র নিয়মিত সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার করছে। এতে মাছের প্রজনন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং বিষাক্ত মাছ খেয়ে বন্যপ্রাণী ও মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
প্লাস্টিক দূষণও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গবেষণায় মোংলা, পশুর ও রূপসা নদীর মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় হরিণা চিংড়িতেও উচ্চমাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব উপাদান ক্যানসার, লিভার জটিলতাসহ বিভিন্ন মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে, গত ২৩ বছরে সুন্দরবনে অন্তত ২৭টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জেলে বা বনজীবীদের অসতর্কতাকে দায়ী করা হলেও এ বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে।
পরিবেশবিদদের অভিযোগ, বনের অভয়াশ্রমগুলোও এখন পুরোপুরি নিরাপদ নয়। অসাধু বন কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে নিষিদ্ধ এলাকায় মাছ শিকার এবং বন্যপ্রাণী পাচারের ঘটনা ঘটছে। ফলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ইরাবতী ডলফিন, শকুনসহ বিভিন্ন বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
তবে বন ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, বন রক্ষায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ড্রোন ব্যবহার, টহল বৃদ্ধি এবং বন অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে চলতি মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের কোনো ঘটনা ঘটেনি। একই সঙ্গে শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মনিটরিং কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
তবে পরিবেশবিদদের মতে, শুধু নজরদারি বা সতর্কবার্তা দিয়ে সুন্দরবন রক্ষা সম্ভব নয়। তারা মোংলা বন্দর ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চলকে টেকসই পরিকল্পনার আওতায় আনার পাশাপাশি দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের সংকট কেবল একটি বনাঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি এবং উপকূলীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই বিশ্ব ঐতিহ্য এই বনকে রক্ষা করতে হলে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।


















