মাত্র এক মাস পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে দেশে ফিরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নির্বাচনী প্রস্তুতিতে দল সাংগঠনিকভাবে চাঙা হলেও গত কয়েক মাসে দেশজুড়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর ধারাবাহিক হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘিরে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, এসব ঘটনায় দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আগের মতো দৃঢ় ও জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না, যা তৃণমূল পর্যায়ে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়াচ্ছে।
দলীয় সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসেই দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর অন্তত ৭০টি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এতে শতাধিক নেতাকর্মী আহত এবং কমপক্ষে ১৩ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে ঢাকা, ঝিনাইদহ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ একাধিক জেলার ঘটনা।
সর্বশেষ গত ৭ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আজিজুর রহমান মুসাব্বির। এর আগে ৩ জানুয়ারি যশোরে পৌর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, ৯ জানুয়ারি জয়পুরহাটে যুবদল নেতা ইয়ানুল হোসেন, ১৭ ডিসেম্বর ঈশ্বরদীতে ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক বিরু মোল্লা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। আরও আগে ১৫ নভেম্বর লক্ষ্মীপুরে এক বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এসব হত্যাকাণ্ডের পর দলীয় পর্যায়ে শোক ও নিন্দা জানানো হলেও বিচার দাবিতে দৃশ্যমান আন্দোলন, সভা-সমাবেশ বা মানববন্ধন দেখা যায়নি—এমন অভিযোগ উঠেছে। মুসাব্বির হত্যার পরও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত শোকবার্তা ও সীমিত বিক্ষোভ ছাড়া বড় কোনো কর্মসূচি দেখা যায়নি।
নয়াপল্টনে জানাজায় উপস্থিত ছিলেন কেবল বিএনপির সিনিয়র নেতা হাবিব উন নবী খান সোহেল। অন্য শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতিতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রকাশ্য ক্ষোভ দেখা যায়।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোক ও নিন্দা জানিয়ে বলেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পরও দুষ্কৃতকারীরা দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। মুসাব্বির হত্যাকাণ্ড সেই অপতৎপরতার নির্মম বহিঃপ্রকাশ।
তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এই হত্যাকাণ্ডকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করায় দলের ভেতরেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. মোরশেদ আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, “আপনি যখন গুম হয়েছিলেন, তখন এই মুসাব্বিররাই রাইফেলের মুখে রাজপথে আন্দোলন করেছিল।”
তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রথমেই জোরালোভাবে বিচার দাবি করা উচিত ছিল।
মোরশেদ আলম আরও বলেন, আগে দল আন্দোলনমুখী থাকায় এ ধরনের ঘটনা ব্যাপকভাবে রাজপথে তোলা হতো। এখন দল নির্বাচনমুখী হওয়ায় সেভাবে আন্দোলন গড়ে উঠছে না।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে ঢাকার বাইরে থেকেও। গত ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মুহাম্মদ জানে আলম সিকদার হত্যার ঘটনায় যুবদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না আসায় প্রশ্ন উঠেছে। যদিও কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যেই এসব সহিংসতা ঘটানো হচ্ছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রকাশ্যে আসছে শীর্ষ নেতাদের মধ্যেও। গোপালগঞ্জে নিজ নির্বাচনি এলাকায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে চলাচলের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমাদের জীবনের হুমকি আছে—তবুও জনগণের পাশে থাকার ঝুঁকি নিয়েছি।”
বিএনপির একাধিক সূত্র বলছে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগে একটি মহল নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। এই অবস্থায় বিএনপি রাজপথে সরব হলে নির্বাচন পরিস্থিতি আরও নেতিবাচক হতে পারে—এই বিবেচনায় দল আপাতত সংযত অবস্থানে রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, “গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ ঠেকাতে কিছু অপশক্তি বাধা সৃষ্টি করতে চায়। তবে এসব অপকর্ম দিয়ে এ দেশের মানুষকে থামানো যাবে না।”
তিনি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের কার্যকর ভূমিকার আহ্বান জানান।
রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন বলেন, মুসাব্বির হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক না ব্যক্তিগত-তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এ ধরনের ঘটনা অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতাই তুলে ধরছে। নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।


















