জামায়াত ইসলামীর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক তৎপরতা থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তারা নির্বাচন পেছাতে চায়। কারণ তারা জানে, ক্ষমতায় যাওয়ার মতো জনসমর্থন তাদের নেই। তাই ডি-ফ্যাক্টোভাবে ক্ষমতার ভেতরে থেকে যতদিন সম্ভব সুবিধা নেওয়াই তাদের লক্ষ্য—এমন মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক নূরুল কবীর।
সম্প্রতি ‘ঠিকানায় খালেদ মুহিউদ্দীন’ টকশো অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বৃহদাংশ এখনো জামায়াতের মতো রাজনৈতিক দলকে রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখতে প্রস্তুত নয়। ফলে নির্বাচন হলে তারা পরাজিত হবে—এই বাস্তবতা থেকেই নির্বাচন প্রলম্বিত করার চেষ্টা করছে দলটি।
নূরুল কবীর বলেন, সরকারের ভেতরে ডানপন্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল মন্ত্রী এবং প্রশাসনের কিছু অংশে তাদের লোক থাকার কারণে জামায়াত নির্বাচন বিলম্বিত করে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে চায়। এতে করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের আরও দমন করার সময় তারা পাবে বলে মনে করছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের ভেতরের লোকজন তাকে জানিয়েছেন—জামায়াতের কাজকর্ম ও রাজনৈতিক তৎপরতা স্পষ্টভাবে নির্বাচন পেছানোর দিকেই ইঙ্গিত করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন
অন্তর্বর্তী সরকারের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নূরুল কবীর বলেন, সরকারে যারা আছেন তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন নেই, তবে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দিগদর্শনের অভাব রয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার সহকর্মীদের রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না বলেই আজকের নানা ব্যর্থতা সামনে এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষায়, রাষ্ট্র একটি পুরোপুরি রাজনৈতিক সংগঠন। এটিকে কোন দিকে কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে বাস্তবায়নের যে দক্ষতা প্রয়োজন—তা সরকারের মধ্যে অনুপস্থিত ছিল।
ড. ইউনূসের বড় ভুলের কথা উল্লেখ প্রধান উপদেষ্টার প্রসঙ্গে নূরুল কবীর বলেন, ক্ষমতায় এসেই গ্রামীণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া ড. ইউনূসের একটি বড় ভুল ছিল। তার মতে, যখন পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত, তখন ব্যক্তিগত বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিষয় আগে দেখা নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সঠিক ছিল না।
তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের দায় ড. ইউনূসকে সারাজীবন বহন করতে হবে। হামলার পেছনে শিবিরের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিজের ওপর হামলার প্রসঙ্গে নূরুল কবীর বলেন, ওই ঘটনায় শিবিরের লোকজন জড়িত ছিল। রাষ্ট্র তাকে মামলা করতে অনুরোধ করলেও তিনি মামলা করেননি, কারণ এটি তিনি ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখেন না।
তার ভাষায়, “আমি একটি সংগঠিত অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে কথা বলি, লিখি। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে হামলা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।”
তিনি অভিযোগ করেন, তাকে রাজনৈতিকভাবে বিরোধিতা করার সাহস না দেখিয়ে ‘আওয়ামী লীগ’ আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে—যা জামায়াতের আরেকটি মুনাফেকির উদাহরণ।
ধর্মের অপব্যবহার ও ইতিহাসের দায়
জামায়াতের বিরুদ্ধে তিনটি প্রধান অভিযোগ তুলে ধরে নূরুল কবীর বলেন,
১. ঐতিহাসিকভাবে তারা মুনাফেকি করে এসেছে
২. ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে
৩. ইসলাম ও জামায়াতকে একাকার করে উপস্থাপন করছে।
তিনি বলেন, ইসলাম বিকশিত হয়েছে জুলুমের বিরুদ্ধে, মজলুমের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পক্ষ নিয়েছিল—যা ছিল জালেমের পক্ষে দাঁড়ানোর শামিল। তার প্রশ্ন, এই ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও জামায়াত কীভাবে নিজেকে ইসলামের শক্তি হিসেবে প্রচার করতে পারে?
‘পরীক্ষা’ হয়ে গেছে ১৯৭১ সালেই নূরুল কবীর বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে জামায়াত নিজেদের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাতে চায়। কিন্তু জনগণ বিকল্প চায় মানেই পশ্চাৎপদ শক্তির উত্থান চায় না।
তিনি বলেন, “জামায়াতকে পরীক্ষা করার কথা বলা হয়। কিন্তু সেই পরীক্ষা তো ১৯৭১ সালেই হয়ে গেছে। দেশের মানুষ যখন সবচেয়ে বিপদের মধ্যে ছিল, তখন তারা নিপীড়িত মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।”


















