বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম-এর প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট কমিউনিকেশনস লিমিটেড (ফাস্টকম বিডি)-কে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। নানা অনিয়ম ও বকেয়া পরিশোধ না করায় আগে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে একই বছরের ৩ ডিসেম্বর ফাস্টকম বিডির ওপর ১০০ শতাংশ সেবা বন্ধের আদেশ (অপারেশনাল ক্যাপ) আরোপ করে বিটিআরসি। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির কাছে আইজিডব্লিউ অপারেটস ফোরাম (আইওএস) অপারেটরদের প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার ৫৭২ মার্কিন ডলার বকেয়া ছিল।
এছাড়া বিটিআরসির কাছেও রাজস্ব ভাগাভাগি ও লাইসেন্স ফি বাবদ প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা বকেয়া ছিল। তবে আইওএস অপারেটরদের বকেয়া পরিশোধ না করে কেবল বিটিআরসির প্রায় ৫০ শতাংশ (প্রায় দুই কোটি টাকা) পরিশোধের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর অপারেশনাল ক্যাপ তুলে নেওয়া হয়।
অথচ একই বছরের ২৫ মে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধ না করলে নতুন ‘টপোলজিতে’ অংশগ্রহণ করা যাবে না। ফলে ফাস্টকম বিডির অনুকূলে সিদ্ধান্ত দিয়ে বিটিআরসি নিজস্ব নির্দেশনাই লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সব পক্ষের আপত্তি ও বিতর্ক উপেক্ষা করে চলতি বছরের ১৬ মার্চ প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে টেলিযোগাযোগ খাতে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজস্ব পাওনা পুরোপুরি বুঝে না পেয়েই কেন একটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে এমন ‘বিশেষ সুবিধা’ দিল।
এ বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারী-এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নেরও কোনো জবাব মেলেনি।
এছাড়া বিটিআরসির কমিশনার (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইকবাল আহমেদ-এর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলে সাড়া পাওয়া যায়নি।
২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ফাস্টকম বিডির বকেয়া নিষ্পত্তি নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়। প্রথমে ২৫ শতাংশ পরিশোধ এবং বাকি অর্থ ১২ কিস্তিতে দেওয়ার প্রস্তাব দেয় প্রতিষ্ঠানটি। পরে তিন কিস্তিতে পরিশোধের নতুন প্রস্তাব দেয়, যেখানে কার্যক্রম শুরুর পর কিস্তি পরিশোধের কথা বলা হয়।
তবে আইওএস অপারেটররা এসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের মতে, নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বকেয়া রেখে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া অন্যায্য।
দুর্নীতি দমন কমিশন-এর আবেদনের পর আদালত এস আলম গ্রুপের কিছু অস্থাবর সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেয়। জব্দ হওয়া দুটি প্রতিষ্ঠান—জেনেসিস টেক্সটাইল অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড অ্যাপারেলস ও লায়ন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস—এর মাধ্যমে ফাস্টকম বিডির ৫৮ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রিত।
এ অবস্থায় সম্পদ জব্দের আওতায় থাকা মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালুর অনুমোদন কতটা আইনসংগত—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিটিআরসির এ সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করবে এবং পুরো টেলিযোগাযোগ খাতের ওপর আস্থা নষ্ট করতে পারে।


















