সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় মোমেনা আলী বিজ্ঞান স্কুলে এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা অবৈধ নিয়োগ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং কোটি টাকা আত্মসাতের সহযোগী অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন স্কুলের সহকারী শিক্ষক (রসায়ন) মোঃ সোহেল রানা।
ডিজির প্রতিনিধি ছাড়াই নিয়োগ, লঙ্ঘন হয় সরকারি বিধিঃ অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৩ সালে মোমেনা আলী বিজ্ঞান স্কুলের বৈকালিক শিফটে সহকারী শিক্ষক (রসায়ন) পদে মোঃ সোহেল রানাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে ওই নিয়োগ বোর্ডে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ডিজি প্রতিনিধি রাখা হয়নি, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়োগ বিধিমালা, ২০০৫ (পরবর্তীতে সংশোধিত) এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা, উল্লাপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্কুলের সভাপতি প্রয়াত মারুফ বীন হাবিব নিজ ক্ষমতাবলে তাকে নিয়োগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইনানুগতা মানা হয়নি এমন অভিযোগ থাকলেও সে সময় কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে পারেননি।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দ্রুত প্রভাব বিস্তার:
নিয়োগের পরপরই সোহেল রানা নিজেকে সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে থাকেন। সূত্র জানায়, তৎকালীন সংসদ সদস্য তানভীর ইমামের ঘনিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিকভাবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। এমপির আশীর্বাদে মোমেনা আলী বিজ্ঞান স্কুলে তার প্রভাব ক্রমশ বিস্তৃত হয়।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, ওই রাজনৈতিক পরিচয়ই পরবর্তীতে তাকে স্কুল প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত ও আর্থিক কর্মকাণ্ডে অদৃশ্য ক্ষমতা দেয়। স্কুলের অর্থের ওপর নজর, গড়ে ওঠে প্রভাবশালী চক্র আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালেই মোমেনা আলী বিজ্ঞান স্কুলে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। তৎকালীন প্রধান শিক্ষক রকিবুল এর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন সোহেল রানা। অভিযোগ রয়েছে, এমপি-ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে স্কুলের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, তহবিলের অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অসদাচরণের অভিযোগে প্রধান শিক্ষক আব্দুল মজিদ বহিস্কৃত হলে সহকারী শিক্ষক রাকিবুল হাসান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন। বর্তমানে রাকিবুল হাসান মোমেনা আলী বিজ্ঞান স্কুলের প্রায় ৭ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দায়ের করা মামলার অভিযুক্ত। তিনি ওই মামলায় কারাভোগও করেছেন।
আইনি নথি ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় সোহেল রানার সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলেও শুরুতে তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ আত্মসাতের কর্মকাণ্ডে সোহেল রানা নেপথ্যে থেকে সহযোগিতা করেছেন।
২০২৩ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনায় দীর্ঘদিন পর আব্দুল মজিদ পুনরায় প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্বপদে যোগদান করেন। যোগদানের পর আবারও সোহেল রানার প্রভাব বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, প্রধান শিক্ষক আব্দুল মজিদের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে বিজ্ঞান স্কুলের দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাত সংক্রান্ত মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় কৌশলে সোহেল রানার নাম বাদ দেওয়া হয়। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বা তদন্ত সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মত আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,ডিজি প্রতিনিধি ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ শুরু থেকেই অবৈধ,অবৈধ নিয়োগের মাধ্যমে প্রাপ্ত সুবিধা ও ক্ষমতা ব্যবহার করে যদি অর্থ আত্মসাত হয়, তবে তা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন এবং দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় (বিশ্বাসভঙ্গ) শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি এ বিষয়ে স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক ও সচেতন মহল শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশি অধিদপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, অবৈধ নিয়োগ থেকে শুরু করে কোটি টাকা আত্মসাতের সহযোগী হিসেবে ঘটনাপ্রবাহ তদন্তের আওতায় না আনলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ফিরবে না।
অবৈধ নিয়োগ হওয়াতে এমপি হয়নিঃ ২০১৯ সালে মোমেনা আলী বিজ্ঞান স্কুলে এমপিও আবেদন করে ১৪ জন শিক্ষক। এরমধ্যে সোহেল রানা ছিলো, তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সঠিক না থাকায় ১৩ জন শিক্ষক এমপিও হলেও সোহেল রানার এমপিও হয়নি। রসায়ন পদে নিয়োগ নিলেও অভিযোগ উঠেছে ২০১৯ সালে ভূয়া নিয়োগ দেখিয়ে ভৌত বিজ্ঞান পদে এমপিও আবেদন করেন।
এ বিষয়ে মোমেনা আলী বিজ্ঞান স্কুলের সহকারী শিক্ষক সোহেল রানা বলেন তিনি বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের এমপি তানভীর ইমামের সাথে ঘনিষ্ঠতা ছিলো প্রাতিষ্ঠানিক কাজের মাধ্যমে। তিনি এমপি তানভীর ইমাম কে ঢাকায় গিয়ে ফুল দিয়ে এসেছে এটাও স্বীকার করেছেন। তবে শিক্ষক রাকিবুল হাসান এর অর্থ আত্মসাৎ এর ঘটনায় তিনি জড়িত নয় বলে দাবি করেন।


















