মোবাশ্বের নেছারী, কুড়িগ্রাম সংবাদদাতাঃ
ব্রহ্মপুত্রের বুকে ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই ধ্বনিত হয় মন্ত্র—“ওঁ ব্রহ্মপুত্র মহাভাগ…”। আর সেই মন্ত্রধ্বনিকে সঙ্গী করে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় নেমে আসে মানুষের ঢল। শতাব্দীপ্রাচীন অষ্টমী স্নান উপলক্ষে পুরো জনপদ যেন পরিণত হয় এক বিশাল আধ্যাত্মিক মহাসমুদ্রে।
চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে প্রায় ৪০০ বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখা এই ধর্মীয় আয়োজন এবারও অনুষ্ঠিত হয়েছে উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে। বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল ৫টা ১৬ মিনিটে শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) দুপুর ২টা ৫৮ মিনিট পর্যন্ত চলে পবিত্র এই স্নান।
ভোরের কুয়াশা ভেদ করে, দূর-দূরান্ত থেকে আগত ভক্তরা ব্রহ্মপুত্রের শীতল জলে ডুব দেন পাপমোচনের আশায়। চিলমারীর জোড়গাছ, রমনা ঘাট, পুরাতন ও নতুন বাজার, মাঝিপাড়া, ব্যাপারীপাড়া, বাঁধের মোড় ও বন্দরসহ প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছিল উপচেপড়া ভিড়। একই চিত্র দেখা গেছে নাগেশ্বরীর নুনখাওয়া ও কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ঘাটেও।
আয়োজক কমিটির তথ্যমতে, এবারের স্নানে অংশ নেন তিন লাখেরও বেশি পুণ্যার্থী। অনেকে কয়েকদিন আগে থেকেই এসে নদীর তীরে অবস্থান নেন, যাতে ভোরের পবিত্র মুহূর্তে স্নান করা যায়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ঋষি পরশুরাম মাতৃহত্যার পাপ মোচনের জন্য এই দিনে ব্রহ্মপুত্রে স্নান করেছিলেন। সেই বিশ্বাস থেকেই যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে এই অষ্টমী স্নান, যা আজও ভক্তদের কাছে গভীর আস্থার প্রতীক।
উৎসবকে ঘিরে উপজেলা প্রশাসন নেয় ব্যাপক প্রস্তুতি। পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে ২৫টি স্থানে ৫০টি পোশাক পরিবর্তন বুথ, ৩০টি টিউবওয়েল ও ৩০টি টয়লেট স্থাপন করা হয়। নির্ধারিত স্নানঘাট হিসেবে রমনা, বলাবাড়ি, রানিগঞ্জ ও ফকিরের হাট নির্ধারণ করে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা হয়।
নিরাপত্তায় ছিল কড়া নজরদারি। সিসিটিভি মনিটরিং, ডুবুরি দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং প্রায় ২০০ স্বেচ্ছাসেবকের সক্রিয় অংশগ্রহণে পুরো আয়োজন সম্পন্ন হয় নির্বিঘ্নভাবে। পাশাপাশি স্থাপন করা হয় অস্থায়ী চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র।
স্নানে অংশ নেওয়া মিনতি রানি বলেন, “নারীদের জন্য আলাদা পোশাক পরিবর্তনের ব্যবস্থা থাকায় অনেক স্বাচ্ছন্দ্যে স্নান করতে পেরেছি।” রংপুরের গংগাচড়া থেকে আগত শেফালী রায় ও সাবিত্রী জানান, “নিরাপত্তা ও পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক ভালো ছিল, ভোগান্তিও কম হয়েছে।” শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ বর্মন (৮৫)
বলেন, “শৈশব থেকে এই স্নানে অংশ নিচ্ছি। এই দিনে ব্রহ্মপুত্রে স্নান করলে এক ধরনের আত্মিক শান্তি পাই।”
তিন শতাধিক পুরোহিতের অংশগ্রহণে দিনভর চলে পূজা-অর্চনা, পিণ্ডদানসহ নানা ধর্মীয় আচার। চিলমারী উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সচীন্দ্র নাথ বর্মন বলেন, “এটি শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ।”
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান জানান, প্রশাসনের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও সবার সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, “সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা হয়েছে।” লাখো মানুষের পদচারণায় মুখর ব্রহ্মপুত্র তীর যেন আবারও জানিয়ে দিল—বিশ্বাস, ঐতিহ্য আর আধ্যাত্মিকতার এই মহামিলন এখনও অটুট, এখনও জীবন্ত।


















