আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের মুকুটহীন সম্রাট হযরত শাহজালাল ইয়ামনি (রহ.) এর ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম উত্তরসূরি এবং হযরত শাহ কামালের বংশধর আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী (রহ.) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম খ্যাতিমান আলেম, চিন্তাবিদ ও সমাজ সংস্কারক। তিনি সত্য, ন্যায় এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের পক্ষে আজীবন সংগ্রাম করেছেন।
ফুলতলী (রহ.) ছিলেন জ্ঞান এবং নৈতিকতার এক অনন্য প্রতীক। তিনি কোরআন ও হাদিসের আলোকে সমাজকে পথ প্রদর্শন করেছেন এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে নিরলস চেষ্টা করেছেন। দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল যেমন বলেছিলেন, “ভালো জীবন মানে হলো জ্ঞানের দ্বারা পরিচালিত জীবন,” ঠিক তেমনিই ফুলতলী ছাহেব (রহ.) তাঁর সমগ্র জীবন জ্ঞানের প্রচার-প্রসার এবং সত্য-সুন্দর ও নৈতিকতার বহিঃপ্রকাশে নিয়োজিত ছিলেন।
তিনি একজন সাহসী নেতাও ছিলেন। জালিম, অনাচার ও বাতিলের বিরুদ্ধে তাঁর কন্ঠ ছিল ধারালো তরবারির মতো। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যদিক ছিল প্রেম, স্নেহ ও মানবিকতার প্রতি গভীর আন্তরিকতা। ইসলাম প্রচারে, আল্লাহতায়ালার দ্বীন কায়েম করতে এবং রাসূল (সাঃ) এর আদর্শ প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন অগ্রসৈনিক।
ফুলতলী (রহ.) এর সমাজসেবামূলক কাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলো আজও মুসলিম সমাজে আলোর দিশারী। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো হল – লতিফিয়া এতিমখানা, দেওরাইল ফুলতলী কামিল মাদরাসা, সোবহানীঘাট কামিল মাদরাসা, বৃদ্ধানিবাস প্রকল্প, ফ্রি ডিসপেনসারী, লতিফিয়া শিক্ষা কল্যাণ ট্রাস্ট, শিক্ষক সংগঠন জমিয়তুল মোদারিছীন এবং দারুল ক্বিরাত মাজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্ট। এসব প্রতিষ্ঠান যুগে যুগে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং মানুষের কল্যাণে অবদান রাখছে।
তিনি পবিত্র কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসসহ ধর্মীয় প্রত্যেক কিতাবের মর্মবাণী উপলব্ধি করে সমাজের সামনে সফলভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর ধার্মিক চিন্তাভাবনা ও বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্ব বাংলার মুসলিম সমাজে প্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
১৫ জানুয়ারি ২০০৮ সালে রাত প্রায় ২টা ৯ মিনিটে তিনি মাওলার সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। তাঁর মৃত্যুতে দেশ-বিদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। ফুলতলী বালাই হাওরের প্রান্তরে হাজার হাজার মানুষ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে নিজ বাড়ির মসজিদের উত্তর দিকে দাফন করা হয়।
ফুলতলী (রহ.) আমাদের মাঝে আর নেই, তবে তাঁর চিন্তাভাবনা, আদর্শ ও মানবিকতার প্রতীক হিসেবে চিরকালই স্মরণীয় থাকবেন। তাঁর জীবন ও অবদান আজও মুসলিম সমাজের জন্য এক শক্তিশালী প্রেরণা।


















