যশোরের শার্শা উপজেলায় বহুল আলোচিত সাতমাইল–গোগা সড়ক নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছেন উপজেলা প্রকৌশলী ছানাউল্লাহ হক।
রোববার (২৮ ডিসেম্বর ২০২৫) দুপুরে শার্শা উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ে সাংবাদিক পরিচয় জানতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে তিনি বলেন,“পুরো বাংলাদেশটাই দুর্নীতিগ্রস্ত—লেখেন! যত পারেন লেখেন! দেশের সব পত্রিকা লিখেছে, তাতে কী হয়েছে?”
নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুললে প্রকৌশলী ছানাউল্লাহ হক দাবি করেন, যাঁরা আগে কাজ বন্ধ করেছিলেন তারাই আবার অর্থের বিনিময়ে কাজ চালু করেছেন।
তিনি বলেন,“আমি দশ দিন পর রিপোর্ট দেব, সব ঠিক আছে। কোথাও কোনো গরমিল নেই।”
নিম্নমানের পাথর, ময়লাযুক্ত খোয়া, পুরনো সামগ্রী ও নির্ধারিত অনুপাতে সিমেন্ট ব্যবহার না করার অভিযোগ তিনি আমলে নিতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার মতো ‘রুচি নেই’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কথোপকথনের মধ্যেই এলজিইডির আরেক কর্মকর্তা কক্ষে প্রবেশ করে জানতে চান—এই সড়ক নির্মাণ নিয়ে কোন সাংবাদিক তাকে ফোন করেছেন। ওই কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়,“ঠিকাদারের লোক এসেছে—এদের দিয়ে শাসিয়ে দিচ্ছি।”
এমন পরিবেশে চা গ্রহণ না করেই কক্ষ ত্যাগ করেন উপস্থিত সাংবাদিকরা।
পরবর্তীতে শার্শা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ও বাগআঁচড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক শাহারিয়ার মাহমুদ রঞ্জু জানান, স্থানীয়দের কাছ থেকে কাজের নিম্নমানের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন,“একদিন কাজ বন্ধ ছিল। কিন্তু সরকারি বন্ধের দিনে কীভাবে আবার সিসি ঢালাই শুরু হলো—তা আমার জানা নেই।”
তিনি প্রকৌশল দপ্তরের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার বসতপুর বাজার এলাকায় প্রায় ৩৫০ মিটার সিসি ঢালাই চলাকালে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ঢালাইয়ের কয়েকদিন পরই সামান্য চাপ দিলেই উঠে আসছিল সিমেন্ট-বালির সঙ্গে মেশানো খোয়া। এতে এলাকাবাসীর ক্ষোভের মুখে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে কাজ বন্ধ করা হলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পুনরায় ঢালাই শুরু হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কোনো অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়ম বহির্ভূতভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন উপজেলা প্রকৌশলী ছানাউল্লাহ হক।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন,“নড়াইলের ‘ইডেন এন্টারপ্রাইজ’ নামে কাজটি দেওয়া হলেও বাস্তবে যশোরের সাঈদ নামের এক ঠিকাদার কাজ করছে। তার হাত অনেক লম্বা।”
এলজিইডি সূত্র জানায়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রকল্প উন্নয়ন সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বাগআঁচড়া ইউনিয়নের সাতমাইল থেকে গোগা বাজার পর্যন্ত ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ কিলোমিটার সড়কের উন্নয়নকাজ চলছে। এর মধ্যে বিভিন্ন বাজার এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার সিসি ঢালাই অন্তর্ভুক্ত।
তবে কাজের শুরু থেকেই নির্ধারিত নকশা ও মানদণ্ড অনুসরণ না করে নিম্নমানের রড, ইট ও পাথর ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত অনুপাতে সিমেন্ট ব্যবহার না করায় পুরো প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, উপজেলা প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ যোগসাজশেই নিম্নমানের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ঢালাইয়ের স্থানে সামান্য চাপ দিলেই খোয়া উঠে আসায় পুরো প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

















