ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় ৮ তারিখ।

সেপ্টেম্বরে ভারতের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে এক সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘ভারতে তার (শেখ হাসিনা) অবস্থানের কারণে কেউ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে না।’ এরপর বিভিন্ন সময় সরকারসংশ্লিষ্ট অনেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতনির্ভরতা কমিয়ে আনার কথা বলেন।
ডিসেম্বরে খাদ্য উপদেষ্টা জানান, ভারতের পাশাপাশি সরকার টু সরকারের মাধ্যমে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানি করা হবে। সে মাসেই আলু ও পেঁয়াজ আমদানিতে ভারতনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস খোঁজার কথা জানায় ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন।
ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করা হয় গত বছরের এপ্রিলে। এছাড়া দেশটি থেকে নিউজপ্রিন্ট, গুঁড়া দুধ, সাইকেল ও মোটর পার্টস, সিরামিকওয়্যার, স্যানিটারিওয়্যার, টাইলসসহ আরো অনেক পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় এনবিআর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্য বর্জনের আহ্বানও ওঠে বিভিন্ন ইস্যুতে। তবে গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) এসবের কোনো প্রভাব ভারত থেকে আমদানিতে পড়তে দেখা যায়নি। বরং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫ (গত বছরের ডিসেম্বরে অর্থ বিভাগ থেকে প্রকাশিত) থেকে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের পণ্য আমদানির প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে ভারত থেকেই গত অর্থবছরে আমদানি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হয়েছে এবং সেটা ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রয়েছে ভারত থেকে সরকারি ক্রয়েরও।
ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে ভারতের বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের পণ্য যাওয়ার ব্যবস্থা গত বছরের ৯ এপ্রিল প্রত্যাহার করে ভারত। এর কয়েকদিন পরই ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ঘোষণা দেয় যে ভারত থেকে সুইং সুতা ও কিছু কাঁচামাল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি বন্ধ করা হবে। সিদ্ধান্তটি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়ায়। সর্বশেষ স্থানীয় শিল্প পণ্যের উৎপাদন সক্ষমতার সুরক্ষা নিশ্চিতে ভারত থেকে সুতা আমদানিতে সেফগার্ড ডিউটি আরোপের ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে নীতিনির্ধারক ও খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
শিল্পায়ন, রফতানিমুখী উৎপাদন ও ভোগ্যপণ্যের চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। অর্থমূল্য বিবেচনায় বাংলাদেশের আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস দেশ চীন। দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস ভারত। মোট আমদানির ৪৪ শতাংশের বেশি হয় এ দুই দেশ থেকে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে আস্থার সংকট তৈরি হয়। এর ধারাবাহিকতায় সময়ে সময়ে সীমান্তে উত্তেজনা, কূটনৈতিক ভাষার কঠোরতা, ভিসা ও কনস্যুলার সেবা সীমিত করা এবং পুশ-ইনসহ নিরাপত্তা ইস্যু সামনে এসেছে।
২০২৫ সালে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল, স্থলবন্দরভিত্তিক আমদানি-রফতানি সীমাবদ্ধকরণ, কাঁচা পাট ও সুতা রফতানি-আমদানিতে বিধিনিষেধের মতো ঘটনায় দুই দেশের টানাপড়েন কূটনীতি ও রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে বাণিজ্য ও অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য আমদানিতে ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আর শুধু ভারত থেকে আমদানি ব্যয়ে প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
দেশভিত্তিক আমদানি ব্যয় নিয়ে অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এ বলা হয়েছে, মোট পণ্য আমদানি মূল্যের ভিত্তিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে সর্বোচ্চ আমদানি করা হয়। যা দেশের মোট আমদানির ৩০ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। মোট আমদানিতে ভারতের অংশ ছিল ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নির্মাণ ও ভোক্তা বাজার—দেশের সব খাতই কোনো না কোনোভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানিনির্ভরতা কমাতে স্থানীয় শিল্পে সক্ষমতা বাড়ানো ও আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণ এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর আমদানি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি হয় ৮৯৮ কোটি ৯০ লাখ ডলারের পণ্য। ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ৯৬৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের পণ্য।
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য গত পাঁচ দশকে ক্রমে বড় হয়েছে। দুই দেশের মোট বাণিজ্যের ৮৫ শতাংশই ভারত থেকে আমদানি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরির্বতন কিংবা এর পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততায়ও এ পরিস্থিতির বদল ঘটেনি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের বাণিজ্য বিশেষ করে ভারত থেকে আমদানি ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মূলত বাজার অর্থনীতির নিজস্ব গতিপথে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অর্থনীতি তার নিজস্ব গতিতে চলে। ভোক্তা যেখানে কম দামে পাবে সেখান থেকে আমদানিকারক আমদানি করে। রফতানিকারক যেখান থেকে কম দামে কাঁচামাল আমদানি করে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে পারে সেখান থেকে সে আনে। সেদিক থেকে বিবেচনায় প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেই দেখা যায় খরচ কম পড়ে, লিড টাইম কম হয়। এমন দেশ ভারত; চীন তো বটেই। তারা অনেক ধরনের উৎপাদন করছে যেগুলোর মান ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনীয়। ফলে এসব দেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে। এটা বাজার অর্থনীতির প্রবণতা।’
বিদ্যমান টানাপড়েন বা সমস্যাগুলো মাঝে মাঝে প্রভাব ফেলে জানিয়ে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়, অশুল্ক বাধা দেয়া হয়। এগুলোতে যে কাজ হয় না তা না। কিন্তু নির্ভর করে যেটুকু বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা অন্য দেশ থেকে আমদানিতে যে পার্থক্য অর্থাৎ ব্যয় এবং সময় থেকে বড় কিনা। যেমন এখন সুতা ল্যান্ডপোর্ট দিয়ে আমদানি বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু তার পরও দেখা যায় যে ভারত থেকে জাহাজে আমদানি করেও চলছে। এখন যদি শুল্ক বাধা অনেক উচ্চ হারে নির্ধারণ হয় তাহলে হয়তো আমদানি করতে পারবে না। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত এসব বাধা সত্ত্বেও সস্তায় আমদানি করা সম্ভব হয় ততক্ষণ পর্যন্ত আমদানি হয় এবং সেটাই আমরা দেখছি।’
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ কর্তৃক সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ও কিছু এলাকায় সীমান্ত অতিক্রম করে কাজ করার অভিযোগ তোলে বাংলাদেশ। বিজিবি একাধিকবার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়। একই সময়ে ‘পুশ-ইন’ বা ভারত থেকে লোকজন জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন দৃশ্যমান রূপ নেয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে ঢাকায় ভারতীয় কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয় এবং পরস্পরের কূটনৈতিক ভাষায় কঠোরতা বাড়ে। মাসের শেষ দিকে ভিসা ও কনস্যুলার সেবা সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়, যা সাধারণ নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সরকার দেশীয় পাটকল ও পাটভিত্তিক শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং মূল্য স্থিতিশীলতার যুক্তি দেখিয়ে কাঁচা পাট রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর করে। ফলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাভিত্তিক পাটকলগুলোতে কাঁচা পাটের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। ভারতীয় ব্যবসায়ী সংগঠন ও শিল্প মালিকরা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক টানাপড়েনের প্রেক্ষাপটে নেয়া এ সিদ্ধান্ত সীমান্ত বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে।
২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিক ও ২০২৫ সালের শুরুতে ভারতের পক্ষ থেকে বিষয়টি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনায় অনানুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত হয়। ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের কাঁচা পাট রফতানি বন্ধ থাকায় ভারতীয় পাট শিল্প আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে এবং বিকল্প উৎস থেকে বেশি দামে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ঢাকার পক্ষ থেকে একে অভ্যন্তরীণ শিল্প সুরক্ষার সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও দিল্লি এটিকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পরিবেশের অবনতির আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দেখে।
২০২৫ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ভারত বাংলাদেশকে দেয়া তৃতীয় দেশে পণ্য পাঠানোর ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করে। এটিকে রাজনৈতিক টানাপড়েনের সরাসরি অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ঘোষণা দেয় যে ভারত থেকে সুইং সুতা ও কিছু কাঁচামাল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি বন্ধ করা হবে। সিদ্ধান্তটি তাৎক্ষণিকভাবে গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতে সরবরাহ চাপ তৈরি করে এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়ায়।
২০২৫ সালের এপ্রিলের শেষ ভাগ ও মে মাসে ভারত পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক পণ্য ও আসবাবসহ কয়েকটি পণ্য স্থলবন্দর দিয়ে আমদানিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে এবং সেগুলোকে সমুদ্রবন্দর দিয়ে আনার নির্দেশ দেয়। এতে বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি রফতানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাস্তব সংকট দেখা দেয়।
২০২৫ সালের মে-জুন সময়ে রেল ও নৌপথে বাংলাদেশ-ভারত পণ্য পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। যেসব কানেক্টিভিটি প্রকল্প এতদিন দুই দেশের সম্পর্কের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হতো, সেগুলো কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এটি বাণিজ্যিক আস্থার অবনতির একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ভারত বাংলাদেশী পণ্যের ক্ষেত্রে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, মান যাচাই ও নন-ট্যারিফ বাধা কঠোর করে। সরাসরি শুল্ক না বাড়ালেও এসব প্রক্রিয়াগত কড়াকড়িকে ঢাকা বাণিজ্যিক চাপ হিসেবে দেখে। গত বছরের ডিসেম্বরে নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা জানিয়ে বাংলাদেশ ভারতে তাদের ভিসা ও কনস্যুলার সেবা সীমিত করে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে ভিসা ও কনস্যুলার সীমাবদ্ধতা কার্যত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জটিল করেছে। খেলার মাঠেও গড়িয়েছে টানাপড়েনের রেশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ধাপে ধাপে রাজনৈতিক আস্থা সংকট থেকে সীমান্ত উত্তেজনা, কূটনৈতিক কঠোরতা এবং শেষ পর্যন্ত বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক টানাপড়েনে রূপ নেয়। ঘটনাগুলো একক কোনো ইস্যুতে সীমাবদ্ধ না থেকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহুস্তরীয় বিরোধে পরিণত হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে দীর্ঘ সময়ের জন্য অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের বিদ্যমান মতপার্থক্য বা দূরত্বের কারণে দুই দেশের আমদানি-রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ বিষয়ে ইন্ডিয়া বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (আইবিসিসিআই) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রফতানিতে প্রভাব পড়েছে, তবে ভারত থেকে আমদানি কার্যক্রম বর্তমানে সঠিকভাবে চলছে। তবে পরিমাণ কমে গেছে। পাশাপাশি দুই দেশ; যেকোনো আমদানিতে পরিবহন খরচটা তুলনামূলক কম পড়ে আমাদের। এ কারণেই প্রভাব খুব একটা পড়েনি। এছাড়া গত বছর বন্ধ থাকলেও সরকার নতুন করে চালসহ অনেক পণ্য আমদানিতে নতুন করে অনুমোদন দিয়েছে। আমরা আশা করছি নির্বাচন হয়ে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’
অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, পণ্য আমদানি ব্যয়ের অর্থমূল্য বিবেচনায় সর্ববৃহৎ উৎস চীন হলেও গত অর্থবছরে দেশটি থেকে আমদানি প্রবৃদ্ধি ছিল ভারতের চেয়ে কিছুটা কম। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চীন থেকে আমদানি হয় ১ হাজার ৯০৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারের পণ্য। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যা ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৫২ কোটি ২০ লাখ ডলারের।
চীন ও ভারতের পর বাংলাদেশের পণ্য আমদানির তৃতীয় বৃহৎ উৎস যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ২৫০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের পণ্য। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ২৮৮ কোটি ৩০ লাখ ডলারের পণ্য। এ হিসেবে অর্থমূল্য বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি কমেছে ১৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গত অর্থবছরে পণ্য আমদানির প্রধান বাজারের মধ্যে মালয়েশিয়া থেকেও আমদানি কমেছে, ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। এছাড়া পণ্য আমদানি কমেছে তাইওয়ান থেকে, ৮ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ।
কূটনৈতিক মহলের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক বহুস্তরীয় এবং জটিল। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের আন্তঃনির্ভরশীলতা আছে অনেক লেয়ারে। সম্পর্ক বহুমাত্রিক। মানে হচ্ছে একটা রাজনৈতিক কাঠামোর সম্পর্ক আছে। একটা কূটনৈতিক কাঠামোর সম্পর্ক আছে। একটা অর্থনৈতিক কাঠামোর সম্পর্ক আছে। আরো আছে মানুষে মানুষে সম্পর্ক। এখন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোটাতে টেনশন চলছে, এটা আমরা জানি। রাজনৈতিক বাতাবরণের যে অবস্থা আমরা দেখছি তার ভিন্ন প্রতিফলন দেখছি অর্থনৈতিক জায়গায়। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাতাবরণের টেনশন হলেও অর্থনীতি ও মানুষের জায়গায় কিন্তু এখনো সেই যোগাযোগ আছে। এ কারণেই আমদানিতে আমরা প্রবৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছি।’
দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েন দীর্ঘমেয়াদি হলে পরিণতি কী হতে পারে জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে যদি সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আমরা কমিয়ে ফেলব, তখন ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ থাকবে না। কিন্তু আমরা ধরে নিচ্ছি যে এ আদান-প্রদানটা এখনো বাধার মুখে পড়েনি। যদিও ভারতের থেকে কিছু বাধা এসেছে। তবে রাজনৈতিক সম্পর্ক যদি খারাপ থাকে তাহলে একটা না একটা সময় গিয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করবে।’


















