মোবাশ্বের নেছারী, কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা :
দুই পা ঠিকমতো চলে না। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন একেকটি যুদ্ধ। শরীর কাঁপে, কথায় জড়তা—তবু স্বপ্নে নেই কোনো ভাটা। দারিদ্র্য, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর জীবনের নির্মম বাস্তবতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এবার এইচএসসি পরীক্ষার হলে বসেছেন কুড়িগ্রামের অদম্য কিশোরী অনামিকা রায়। উত্তরপত্রে লেখা প্রতিটি শব্দ যেন তার অদম্য সাহস, সংগ্রাম আর স্বপ্ন জয়ের এক অনবদ্য দলিল।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বোয়াইলভীর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ ভেন্যু কেন্দ্রের রাবাইতাড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে দেখা যায়, পরীক্ষা শুরুর অনেক আগেই কেন্দ্রে পৌঁছে যান অনামিকা। ঘণ্টা বাজতেই ধীরে ধীরে উত্তরপত্রে লিখতে শুরু করেন। এক হাতে কলম ছুটছে, অন্যদিকে কাঁপছে পুরো শরীর। শরীর সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে প্রতিটি লাইন লিখছেন অক্লান্ত চেষ্টায়। দৃশ্যটি উপস্থিত অনেককেই আবেগাপ্লুত করে তোলে।
চলতি শিক্ষাবর্ষে ফুলবাড়ী উপজেলার কাশীপুর কলেজের ডিজিটাল টেকনোলজি অ্যান্ড বিজনেস শাখা থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন তিনি। তার রোল নম্বর ৪৯৬৭৪২। এর আগে ২০২৪ সালে নাগেশ্বরী উপজেলার গাগলা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-২.৭২ অর্জন করেন।
জন্মের পাঁচ বছর পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন অনামিকা। এরপর থেকেই তার দুই পা হাঁটুর নিচ থেকে বেঁকে যায়। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না। কথাবার্তায়ও রয়েছে জড়তা। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে কখনোই নিজের স্বপ্নের পথে বাধা হতে দেননি তিনি। বরং প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই এগিয়ে চলেছেন প্রতিদিন।
অনামিকার বাড়ি নাগেশ্বরী উপজেলার গাগলা ইউনিয়নের ব্যাঙের দোলা গ্রামে। বাবা অনিল চন্দ্র একজন দিনমজুর কৃষিশ্রমিক, মা কাঞ্চনমালা গৃহিণী। সাত ভাইবোনের মধ্যে অনামিকা সবচেয়ে ছোট। তার এক ছোট ভাইও শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
অভাব যেন এ পরিবারের নিত্যসঙ্গী। মাত্র ২৪ শতক বাড়িভিটা ছাড়া নেই কোনো আবাদি জমি। দিনমজুরির আয়ে কোনোমতে চলে সংসার। তিন মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন বাবা। তবুও মেয়ের লেখাপড়ার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে লড়ে যাচ্ছেন তিনি।
চোখের কোণে জল নিয়ে অনিল চন্দ্র বলেন, “দিনমজুরি করে সংসার চালাই। যেদিন কাজ পাই না, সেদিন ধার করে চলতে হয়। অনামিকার পড়ার খুব ইচ্ছা। কিন্তু অভাবের কারণে কতদিন পারব জানি না। কেউ যদি ওর পড়াশোনার দায়িত্ব নিত, তাহলে মেয়েটা অনেক দূর যেতে পারত।”
নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে অনামিকার চোখে ফুটে ওঠে অদম্য আত্মবিশ্বাস। তিনি বলেন, “আমি পড়াশোনা শেষ করে একজন শিক্ষক হতে চাই। আমার মতো অসহায় ও পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে চাই। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।”
কাশীপুর কলেজের প্রভাষক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “অনামিকা অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। সুযোগ-সুবিধা ও সহযোগিতা পেলে সে অবশ্যই তার স্বপ্ন পূরণ করবে।”
কেন্দ্র সচিব ও অধ্যক্ষ আব্দুর রহিম বলেন, “শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই তার মনোবল ভাঙতে পারেনি। সে আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণা। যথাযথ সহায়তা পেলে ভবিষ্যতে সে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।”
অনামিকা রায়ের গল্প কেবল একজন এইচএসসি পরীক্ষার্থীর গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের অদম্য জয়ের গল্প। এটি এমন এক স্বপ্নবাজ তরুণীর গল্প, যিনি প্রমাণ করে চলেছেন—শরীর নয়, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ইচ্ছাশক্তি। আর সেই ইচ্ছাশক্তিই একদিন তাকে পৌঁছে দিতে পারে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে।


















