মোবাশ্বের নেছারী, কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা :
মানুষের জীবনরক্ষাকারী পণ্য ওষুধ—কিন্তু সেই ওষুধ নিয়েই কুড়িগ্রামে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য সংকট। অভিযোগ উঠেছে, সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে ওষুধের বাজার। কম দামে বিক্রি করতে গেলেই বাধা, এমনকি ভয়ভীতির মুখেও পড়তে হচ্ছে ফার্মেসি ব্যবসায়ীদের।
ফলে সাধারণ ক্রেতারা পড়ছেন চরম বিপাকে। একই ওষুধ কিনতে হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন দামে—ন্যায্য মূল্য যেন হয়ে উঠেছে অধরা।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু চক্র ওষুধের বাজারে অঘোষিত মূল্য নির্ধারণ, প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ এবং বৈধ ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন কুড়িগ্রাম জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু ও সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু।
অভিযোগে বলা হয়, কোনো ফার্মেসি যদি ওষুধের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি)-এর চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে চায়, তখনই বাধা দেওয়া হচ্ছে। কখনো সরাসরি চাপ, কখনো হুমকি—সব মিলিয়ে বাজারে তৈরি হয়েছে এক ধরনের কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ধারা ৪০, ৪১ ও ৪৫ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বিষয়টি ইতোমধ্যে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। সভায় জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ, পুলিশ সুপার খন্দকার ফজলে রাব্বি এবং সেনাবাহিনীর কুড়িগ্রাম ক্যাম্প কমান্ডার মেজর ইনজামুল আলমসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।
জেলা ঔষধ তত্ত্বাবধায়ক হাফিজুর রহমান জানান, জেলায় ২ হাজার ২৬৫টি ফার্মেসির মাধ্যমে ওষুধ বিক্রি হয়। তাদের দপ্তর মূলত ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ করে, মূল্য নির্ধারণ করে না। তবে কুড়িগ্রাম শহর ও উলিপুরে দামের অসঙ্গতি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
অন্যদিকে কুড়িগ্রাম জেলা কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির আহ্বায়ক আতাউর রহমান হেরিক বলেন, কোম্পানিগুলো থেকে সীমিত ছাড় পাওয়ায় কম দামে বিক্রি করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এমআরপি অনুযায়ী বিক্রির আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শেখ সাদী স্পষ্ট করে বলেন, “এমআরপি হলো সর্বোচ্চ মূল্যসীমা—এর বেশি নেওয়া যাবে না। তবে কম দামে বিক্রিতে কোনো আইনগত বাধা নেই। কেউ এতে বাধা দিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে সাধারণ ক্রেতাদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। তাদের অভিযোগ, একই ওষুধ একেক দোকানে একেক দামে বিক্রি হচ্ছে—যা তৈরি করছে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ। অনেকেই বলছেন, “কম দামে কিনতে গেলেই নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়।”
জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ওষুধের মতো জরুরি খাতে যদি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য চলতেই থাকে, তাহলে এর প্রভাব শুধু বাজারে নয়—মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যেও পড়বে মারাত্মকভাবে। এখন প্রশ্ন—এই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে কতটা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।


















