ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাগেরহাট-৩ (মোংলা–রামপাল) আসনের ভোটের সমীকরণ এবার পুরোপুরি বদলে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে দলটির কোনো প্রার্থী না থাকায় নির্বাচনী মাঠে সৃষ্টি হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। প্রধান দুই দলের জনপ্রিয়তা প্রায় সমান সমান হওয়ায় লড়াই হয়ে উঠেছে হাড্ডাহাড্ডি।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকায় দলটির বিশাল ভোটব্যাংক এখন অনিশ্চিত ও নীরব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘নীরব ভোটব্যাংকই’ এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে পক্ষ এই ভোট নিজেদের দিকে টানতে পারবে, জয় অনেকটাই তাদের দিকেই যাবে।
গুরুত্বপূর্ণ আসনে অনিশ্চিত ভোটব্যাংক
সুন্দরবনের কোলঘেঁষা দেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মোংলা ও পার্শ্ববর্তী রামপাল উপজেলা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট-৩ আসনটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোংলা পোর্ট পৌরসভাসহ ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগই জয়ী হয়েছে—কখনো এককভাবে, কখনো জোটবদ্ধভাবে।
তবে এবারের নির্বাচন সেই ধারায় বড় ধরনের ছেদ টানতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলের বেশিরভাগ নেতা-কর্মী আত্মগোপনে থাকায় সংগঠিতভাবে ভোটে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এই আসনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। অতীতে এই ভোটের বড় অংশ আওয়ামী লীগের পক্ষে গেলেও এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত অনেক সংখ্যালঘু নেতাকর্মী এখনও আত্মগোপনে থাকায় তাদের পরিবারের ভোট সিদ্ধান্ত নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা।
বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যালঘু ভোট যেদিকে যাবে, শেষ পর্যন্ত ফলাফল সেদিকেই হেলে পড়তে পারে। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জয় তাদেরই হবে।
বিএনপির এক জোট নেতা জানান,“আমাদের প্রার্থী ড. ফরিদ গত ২০ বছর ধরে রামপাল-মোংলার মানুষের পাশে কাজ করেছেন। মানুষ এবার প্রতীক নয়, যোগ্য প্রার্থীকে বেছে নেবে।”
এ বিষয়ে বিএনপির প্রার্থী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন,“বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমরা নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। ভোটে তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।”
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ শেখ বলেন,
“আওয়ামী লীগ পতনের পর এলাকায় সন্ত্রাস ও রাহাজানি ঠেকাতে জামায়াতের নেতাকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করেছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় আমরা পাশে দাঁড়িয়েছি।”
এলাকাজুড়ে এখন প্রচার-প্রচারণায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক গণসংযোগ চালাচ্ছেন। তবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রচারণা তেমন চোখে পড়ছে না। একইভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপির সাবেক জেলা সভাপতি এম এ এইচ সেলিমেরও উল্লেখযোগ্য কোনো প্রচারণা নেই।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই এবার দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ, সততা ও কাজের রেকর্ডকে বেশি গুরুত্ব দিতে চান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের বড় ভোটব্যাংক যদি বিভক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে ফল হবে হাড্ডাহাড্ডি। আর যদি কোনো একটি পক্ষ সেই ভোটের বড় অংশ নিজেদের দিকে নিতে পারে, তবে ফল একতরফাও হতে পারে।
দুই লাখ ৬৬ হাজার ৮৬৪ ভোটারের মন জয় করে শেষ পর্যন্ত কে হবেন বিজয়ী—তার উত্তর মিলবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির গভীর রাতে।


















