বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে আবারও ভয়াবহ আকারে ফিরে এসেছে বনদস্যুদের উৎপাত। বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির ঘাটতির সুযোগে ‘দুলাভাই বাহিনী’সহ অন্তত ২০টির বেশি দস্যু দল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জেলেদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, অস্ত্রের মুখে নৌকা ও মাছ লুট। সব মিলিয়ে সুন্দরবন ফের আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে।
মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা এবং উদ্ধার হওয়া জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক বছরে অন্তত তিন শতাধিক জেলে ও বনজীবী দস্যুদের হাতে অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শুধু গত তিন মাসেই শতাধিক জেলেকে জিম্মি করা হয়েছে। বর্তমানে এখনও ১৫ থেকে ২০ জন জেলে বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর কাছে জিম্মি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন বনজীবীরা।
দস্যুরা ধারালো অস্ত্র ও দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে জেলেদের সবকিছু কেড়ে নিচ্ছে। নৌকা প্রতি ২০–৩০ হাজার টাকা চাঁদা এবং অপহরণের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে।
২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ধাপে ধাপে সুন্দরবন অঞ্চলের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তারা জমা দিয়েছিলেন ৪৬২টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪ রাউন্ড গোলাবারুদ। এর পর ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সরকার সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করে।
কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে পুরোনো ও নতুন দস্যু বাহিনী। আত্মসমর্পণকারী অন্তত ১৩ জন দস্যু ফের অপরাধ জগতে ফিরে গেছেন বলে জানা গেছে।
একসময় সুন্দরবনের ত্রাস ছিল ‘ইলিয়াস বাহিনী’। ইলিয়াস আত্মসমর্পণের পর মারা গেলেও ২০২৪ সালের আগস্টে তার বোনের স্বামী রবিউল নতুন দল গড়ে তোলেন, যা স্থানীয়ভাবে পরিচিত হয় ‘দুলাভাই বাহিনী’ নামে।
বর্তমানে সক্রিয় উল্লেখযোগ্য বাহিনীগুলোর মধ্যে রয়েছে, আসাবুর বাহিনী, করিম শরীফ বাহিনী, আবদুল্লাহ বাহিনী, মঞ্জুর বাহিনী, দয়াল বাহিনী, রবি বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, রাঙ্গা বাহিনী, সুমন বাহিনী, আনারুল বাহিনী, হান্নান বাহিনী, আলিফ বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী, দাদাভাই বাহিনী, ইলিয়াস বাহিনী ও মজনু বাহিনী। প্রতিটি বাহিনীতে ১৫ থেকে ৪০ জন সদস্য রয়েছে এবং সবার হাতেই রয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র।
জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর শেখ, দাদাভাই বাহিনীর প্রধান জয়নাল আবেদীন ওরফে রাজন এবং মঞ্জুর বাহিনীর প্রধান মঞ্জুর সরদার—এরা সবাই একসময় আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তাদের ভাষ্য, স্বাভাবিক জীবনে ফিরেও সামাজিক অবহেলা, কর্মসংস্থানের অভাব ও প্রশাসনিক হয়রানির কারণে অনেকে হতাশ হয়ে আবার দস্যুতায় ফিরেছেন। তবে নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পেলে তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আগ্রহী।
জেলেদের অভিযোগ, বন সংলগ্ন এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি দস্যুদের গডফাদার ও সোর্স হিসেবে কাজ করছে। তারাই মুক্তিপণের টাকা সংগ্রহ ও পৌঁছে দিচ্ছে। দস্যুদের দেওয়া বিশেষ সংকেতযুক্ত টোকেন থাকলে নৌকায় নিরাপদে মাছ ধরতে দেওয়া হয়। ভয়ের কারণে জেলে বা মহাজন কেউই প্রকাশ্যে দস্যুদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।
সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, দস্যুদের দাপটে উপকূলীয় অর্থনীতি ও জীবন-জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
সুন্দরবন রক্ষায় আমরা সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী মো. নূর আলম শেখ বলেন, দস্যুরা শুধু অপহরণ নয়-বাঘ, হরিণ শিকার এবং কাঠ পাচারের সঙ্গেও জড়িত, যা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি।
মোংলা কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের স্টাফ অফিসার লে. কমান্ডার আবরার হাসান জানান, গত এক বছরে ২৭টি অভিযানে ৪৪ জন দস্যু ও সহযোগী আটক করা হয়েছে এবং উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ।
বাগেরহাট সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করীম চৌধুরী বলেন, দস্যু দমনে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি চলছে

















